পর্ষদের প্রতারণায় হুমকিতে অস্তিত্ব
ইন্দো-বাংলায় ভূয়া সম্পদ কেনার তথ্যের আড়ালে কোটি কোটি টাকা গায়েব
ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) : ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের থেকে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলেও সংকুচিত হয়েছে। যে কোম্পানিটিতে ভূয়া সম্পদ কেনার নামে কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যাতে কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হুমকিতে পড়েছে।
কোম্পানিটির পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এ.এফ.এম আনোয়ারুল হক এবং পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আজিজা ইয়াসমিন, মো. শরিকুল আনাম, হাফিজা ইয়াসমিন, ...
ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) : ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের থেকে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলেও সংকুচিত হয়েছে। যে কোম্পানিটিতে ভূয়া সম্পদ কেনার নামে কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যাতে কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হুমকিতে পড়েছে।
কোম্পানিটির পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা। এছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এ.এফ.এম আনোয়ারুল হক এবং পরিচালক হিসেবে রয়েছেন আজিজা ইয়াসমিন, মো. শরিকুল আনাম, হাফিজা ইয়াসমিন, এ.কে.এম হারুনুর রশীদ, ইসরাত জাহান রিমি ও মো. নজরুল ইসলাম রয়েছেন।
ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ ভয়াবহ প্রতারণা করছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, কোম্পানিটিতে যে যার মতো করে চুষে নিচ্ছে। এখন আর তেমন নেই। লুটেপুটে এক প্রকার শেষ করে দিয়েছে। ভূয়া সম্পদ কেনার নামে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এমন কোন প্রতারণা নেই, যা কোম্পানিটিতে করা হয়নি।
২০১৮ সালে শেয়ারবাজার থেকে ২০ কোটি টাকা উত্তোলন করে ইন্দো-বাংলা ফার্মা। এরমধ্যে ৫.৮৬ কোটি টাকা দিয়ে ভবন নির্মাণ ও ১২.৪৭ কোটি টাকা দিয়ে মেশিনারিজ কিনবে বলে জানিয়েছিল। ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শেয়ারবাজার থেকে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়।
তবে কোম্পানিটির ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়েছে। এ কোম্পানিটির আইপিওকালীন ৭৩ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন দিয়ে শেয়ারপ্রতি ২.৬২ টাকা হিসাবে ৫.৯০ কোটি টাকার মুনাফা হয়েছিল। সেই কোম্পানির আইপিও ও বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধন ১১৬.২১ কোটি টাকায় উন্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিশোধিত মূলধন বেড়েছে ৪৩.২১ কোটি টাকা বা ৫৯ শতাংশ। মূলধনে এমন উত্থান হলেও কোম্পানিটি তলানিতে। শেষ ২ অর্থবছর ধরে রয়েছে লোকসানে। এরমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ০.৩২ টাকা করে মোট ৩.৬৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) (যেসব স্থায়ী সম্পদ ব্যবহার উপযোগী হয়নি) নামের ভূয়া সম্পদ কেনার তথ্য দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে।
ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে ৩.৩২ কোটি টাকা। এরমধ্যে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ২.৩১ কোটি টাকার মেশিনারীজ ও ১.০১ কোটি টাকার নির্মাণাধীন অবকাঠামো দেখায়। এছাড়া ওই অর্থবছরে ৬১ লাখ টাকার অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ায় সিডব্লিউআইপি থেকে স্থায়ী সম্পদে ট্রান্সফার করা হয়েছে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এসব সম্পদের অস্তিত্ব নিয়ে নিরীক্ষককে কোন প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। এভাবে ভূয়া প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা।
এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ গোপনে টাকা আত্মসাৎ করে হাতে নগদ ও ব্যাংকে জমা রয়েছে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। যাতে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করা ৪৩ লাখ টাকার নগদ তথ্যের ব্যাংক বুক/রেজিস্টার দেখাতে পারেনি।
ওষুধ বিক্রি নিয়েও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ। আর্থিক হিসাবে তারা ২১.১৮ কোটি টাকার (ভ্যাটসহ) ওষুধ বিক্রি করেছে দাবি করলেও নিরীক্ষক ব্যাংকে পেয়েছেন ১৫.১১ কোটি টাকার ডিপোজিট। এক্ষেত্রে পার্থক্য ৬.০৭ কোটি টাকা। এ বিষয়ে নিরীক্ষককে জবাব দিতে পারেনি ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া ওই ওষুধ বিক্রির মধ্যে ২.৭৬ কোটি টাকার ভ্যাট জমার প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ।
ইন্দো-বাংলা কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ১২৬.৪৬ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ উল্লেখ করেছে। তবে এরমধ্যে জমি উন্নয়নের ব্যয়ের তথ্য দেখাতে পারেনি। এছাড়া কোম্পানিটির মজুদ পণ্য হিসাবে প্রস্তুতকৃত ৭৮ লাখ টাকার ৩৭০৫০টি ‘ক্যালফ্রেশ-এম ট্যাবলেট’ কম দেখিয়েছে।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কোম্পানিটির গত ২ অর্থবছরে ৭.৭৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এছাড়া অপ্রত্যাশিত সংকট মোকাবেলায় কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং তারল্য অপর্যাপ্ত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি কোম্পানিটির ইন্টারনাল কন্ট্রোল ভেঙ্গে পড়েছে। এ অবস্থায় কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হুমকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব মহি উদ্দিন অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, কিছু সমস্যা হয়েছে। এগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
অনিয়মের বিষয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মূখপাত্র মো: আবুল কালাম অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, অর্থবছর শেষে নিরীক্ষকের মতামতসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন কমিশনে আসে। যা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যাচাই-বাছাই করে। এতে কোন অনিয়ম বা অসঙ্গতি পেলে, কমিশন আইন অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ইন্দো-বাংলায়ও তার ব্যতিক্রম হবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ইন্দো-বাংলার পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১১৬ কোটি ২১ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৭৫.৫৭ শতাংশ মালিকানা রয়েছে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের হাতে। কোম্পানিটির মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ১২.২০ টাকায়।
