কাট্টলি টেক্সটাইলের কাগুজে সম্পদের আড়ালে কোটি কোটি টাকা গায়েব
ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের থেকে ৩৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে কাট্টলি টেক্সটাইলের। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলেও সংকুচিত হয়েছে। যে কোম্পানিটিতে কয়েকভাবে কাগুজে ভুয়া সম্পদ দেখানোর মাধ্যমে কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যাতে কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হুমকিতে পড়েছে।
এ কোম্পানিটির পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন নাসরিন হক। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এমদাদুল হক।
বিতর্কিত ইস্যু ম্যানেজার এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের হাত ...
ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) : ব্যবসায় সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের থেকে ৩৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে কাট্টলি টেক্সটাইলের। তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ না হলেও সংকুচিত হয়েছে। যে কোম্পানিটিতে কয়েকভাবে কাগুজে ভুয়া সম্পদ দেখানোর মাধ্যমে কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। যাতে কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই হুমকিতে পড়েছে।
এ কোম্পানিটির পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন নাসরিন হক। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এমদাদুল হক।
বিতর্কিত ইস্যু ম্যানেজার এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের হাত ধরে ২০১৮ সালে শেয়ারবাজার থেকে ৩৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে কাট্টলি টেক্সটাইল। ওইসময় নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিতর্কিত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সিরাজ খান বশাক অ্যান্ড কোং। কোম্পানিটি আইপিও ফান্ডের ১৭.২৮ কোটি টাকা দিয়ে ভবন নির্মাণ, ২.৫৩ কোটি টাকা দিয়ে কর্মীদের জন্য ডরমিটরি নির্মাণ, ৮.৯৮ কোটি টাকা দিয়ে মেশিনারিজ ক্রয়, ৮০ লাখ টাকা দিয়ে জেনারেটর ক্রয়, ২.৫০ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবে বলে জানিয়েছিল। অর্থাৎ ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শেয়ারবাজার থেকে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়।
তবে কোম্পানিটির ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়েছে। এ কোম্পানিটির আইপিওকালীন (২০১৬-১৭ অর্থবছর) ৫৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন দিয়ে শেয়ারপ্রতি ২.০৭ টাকা করে ১০.৬৯ কোটি টাকার মুনাফা হয়েছিল। সেই কোম্পানির আইপিও ও বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধন ১১৬.৩১ কোটি টাকায় উন্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিশোধিত মূলধন বেড়েছে ৬১.৩১ কোটি টাকা বা ১১১ শতাংশ। মূলধনে এমন উত্থান হলেও কোম্পানিটি তলানিতে। কোম্পানিটির শেষ অর্থবছরে (২০২৪-২৫) নামমাত্র বা শেয়ারপ্রতি ০.০৮ টাকা মুনাফা হলেও আগের ২ অর্থবছরে হয়েছে লোকসান। এরমধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ০.৩২ টাকা করে মোট ৩.৬৮ কোটি টাকা ও ২০২৩-৩৪ অর্থবছরে ০.৮৪ টাকা করে ৯.৮২ কোটি টাকা লোকসান হয়।
এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) (যেসব স্থায়ী সম্পদ ব্যবহার উপযোগী হয়নি বা নির্মাণাধীন) নামের ভুয়া সম্পদ কেনার তথ্য দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা গায়েব করে দিয়েছে।
কাট্টলি টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) দেখিয়েছে ১০.৩২ কোটি টাকা। কয়েক বছর ধরে এই সম্পদ একইভাবে দেখিয়ে আসছে। এর কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এসব সম্পদের অস্তিত্ব নিয়ে নিরীক্ষককে কোন প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। এভাবে ভুয়া প্রকল্প ব্যয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকা।
এ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র নির্মাণাধীন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তারা কাঁচামাল কেনার জন্য গ্রাহককে অগ্রিম প্রদানের তথ্যের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কাট্টলি টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে কাঁচামাল কেনার জন্য সরবরাহকারী বা বিক্রেতাকে ১৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করেছে বলে তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে এ বিষয়ে নিরীক্ষককে প্রমাণাদি দিতে পারেননি। এক্ষেত্রে তারা নিজেরা টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভুয়া অগ্রিম প্রদান হিসেবে কাগুজে সম্পদ দেখিয়ে আসছে। যা পরবর্তীতে আদায়যোগ্য নয় বিবেচনায় লোকসান দেখানো হবে। এরমধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়ে গেছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
কাট্টলি টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা পাবে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু প্রমাণাদি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র যাচাইয়ে ওই অর্থের সত্যতা পায়নি নিরীক্ষক। এক্ষেত্রেও ভুয়া সম্পদ দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কাট্টলি কর্তৃপক্ষ।
এসব বিষয়ে হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ টাকা আত্মসাতের জন্য কোম্পানিতে ভুয়া সম্পদ দেখায়। ওই সম্পদ কেনা হয়েছে বা আছে দেখিয়ে টাকা বের করে নেয়। পরবর্তীতে ওইসব ভুয়া সম্পদকে লোকসান বা অতিরঞ্জিত রেখে দেওয়া হয়। কাট্টলি টেক্সটাইলেও এমনটি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কাট্টলি টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ ২০২০-২১ অর্থবছরের ব্যবসায় ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার লভ্যাংশ বিতরণ করেনি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
এসব বিষয়ে জানতে কাট্টলি টেক্সটাইলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ফজলুল হকের সঙ্গে দুই দফায় যোগাযোগ করা হলেও কোন মন্তব্য করেননি। এছাড়া কোম্পানিতে মেইল করেও প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি।
এসব অনিয়মের বিষয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মূখপাত্র মো: আবুল কালাম অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, অর্থবছর শেষে নিরীক্ষকের মতামতসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন কমিশনে আসে। যা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যাচাই-বাছাই করে। এতে কোন অনিয়ম বা অসঙ্গতি পেলে, কমিশন আইন অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কাট্টলি টেক্সটাইলেও তার ব্যতিক্রম হবে না।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কাট্টলি টেক্সটাইলের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১১৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৬৯.৬৮ শতাংশ মালিকানা রয়েছে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের হাতে। কোম্পানিটির সোমবার (০২ মার্চ) শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ৯.২০ টাকায়।
