ফিরলেন শার্লক হোমস
বিনোদন ডেস্ক : গ্যাংস্টার কমেডি সিনেমা বা বড় পরিসরের অ্যাকশন–অ্যাডভেঞ্জার গাই রিচিকে অনেকভাবেই মনে রাখা যায়। তবে রহস্যপ্রেমীরা এই ব্রিটিশ নির্মাতাকে আলাদাভাবে মনে রাখবেন শার্লক হোমসকে পর্দায় নিয়ে আসার জন্য। ২০১১ সালে রবার্ট ডাউনি জুনিয়রকে নিয়ে ‘শার্লক হোমস’ সিনেমা বানান রিচি, পরে আসে এর সিকুয়েলও। অস্কার মনোনয়নের সঙ্গে বক্স অফিসে ব্যবসাও করেছিল সিনেমাগুলো। সঙ্গে এই শতকে প্রখ্যাত এই গোয়েন্দার চলচ্চিত্র রূপায়ণে নতুন মানদণ্ডও তৈরি করেন রিচি। দীর্ঘ বিরতির পর গাই ...
বিনোদন ডেস্ক : গ্যাংস্টার কমেডি সিনেমা বা বড় পরিসরের অ্যাকশন–অ্যাডভেঞ্জার গাই রিচিকে অনেকভাবেই মনে রাখা যায়। তবে রহস্যপ্রেমীরা এই ব্রিটিশ নির্মাতাকে আলাদাভাবে মনে রাখবেন শার্লক হোমসকে পর্দায় নিয়ে আসার জন্য। ২০১১ সালে রবার্ট ডাউনি জুনিয়রকে নিয়ে ‘শার্লক হোমস’ সিনেমা বানান রিচি, পরে আসে এর সিকুয়েলও। অস্কার মনোনয়নের সঙ্গে বক্স অফিসে ব্যবসাও করেছিল সিনেমাগুলো। সঙ্গে এই শতকে প্রখ্যাত এই গোয়েন্দার চলচ্চিত্র রূপায়ণে নতুন মানদণ্ডও তৈরি করেন রিচি। দীর্ঘ বিরতির পর গাই রিচি যখন আবার শার্লকের গল্প বলবেন নিশ্চিতভাবেই সেটা আলাদা আগ্রহ তৈরি করে। গত মাসে মুক্তি পাওয়া অ্যামাজনের সিরিজ ‘ইয়ং শার্লক’ নিয়েও তাই শার্লক–ভক্তদের তুমুল কৌতূহল ছিল; গাই রিচি কি পারলেন এবার প্রত্যাশা মেটাতে?
একনজরে সিরিজ: ‘ইয়ং শার্লক’ ধরন: মিস্ট্রি, অ্যাডভেঞ্চার পরিচালনা: গাই রিচি, অ্যান্ডার্স অ্যাংস্ট্রোম, ড্যানি গর্ডন ও ট্রাইসিয়া ব্রুক অভিনয়: হিরো ফিনিস টিফিন, ডোনাল ফিন, ম্যাক্স আয়রনস, জোসেফ ফিনিস, নাতাশা ম্যাকেলহোন, জিনে সেং স্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও পর্ব সংখ্যা: ৮ রানটাইম: ৪৬–৫৫ মিনিট ‘ইয়ং শার্লক’-এর গল্প শুরু হয় সেই সময়ে, যখন শার্লক কিংবদন্তি গোয়েন্দা হয়ে ওঠেননি। বয়স মাত্র ১৯। এক রকম বখাটে, পকেটমারে পারদর্শী এক তরুণ, যাঁর জীবন বারবার বিপদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। জেল থেকে মুক্তি পেতে তাঁকে সাহায্য করে তাঁর বড় ভাই মাইক্রফট হোমস (ম্যাক্স আয়রনস)। তরুণ শার্লক (হিরো ফিনিস টিফিন) অগোছাল, বিদ্রোহী, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।
পরিবারের অবস্থাও জটিল। বাবা সেলাস (জোসেফ ফিনিস) বাড়ি থেকে দূরে থাকেন, গবেষণায় ব্যস্ত। মা কর্ডেলিয়া (নাতাশা ম্যাকেলহোন) মানসিক চিকিৎসালয়ে বন্দী। ছোট বোনের মৃত্যু পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে। এই ট্র্যাজেডিই শার্লকের মানসিক গঠনে গভীর ছাপ ফেলে।
শার্লক হোমসের নাম শুনলেই দর্শক দারুণ বুদ্ধিমান আর পর্যবেক্ষণে সিদ্ধহস্ত কাউকে আশা করেন। কিন্তু রিচি এখানে শার্লককে ভিন্ন পথে নিয়ে গেছেন। সিরিজের শুরুতেই দেখা যায় শার্লক ছোটখাটো অপরাধের জন্য কারাবন্দী। ভাই মাইক্রফট হোমস উদ্ধার করে অক্সফোর্ডে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তবে সেখানে সরাসরি ভর্তি নয়, বরং তিনি স্কুলের পোর্টারের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই অংশটি খুব অল্প সময় ধরে দেখা যায়, যেন দর্শককে বোঝানো হয় শার্লককে বিনম্র হতে শেখানো হচ্ছে, কিন্তু আসল গল্পের সঙ্গে এটি খুব বেশি সম্পর্কিত নয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে গিয়ে শার্লক জড়িয়ে পড়েন এক জটিল ঘটনায়—চুরি হয়ে যায় এক গুরুত্বপূর্ণ চীনা স্ক্রল, যা নিয়ে এসেছিলেন প্রিন্সেস গুলুন শোআন (জিনে সেং)। ঘটনাটি দ্রুতই রূপ নেয় বড় এক ষড়যন্ত্রে, যেখানে খুন, বিস্ফোরণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়া জড়িয়ে পড়ে।
এই তদন্তে শার্লকের সঙ্গী হন জেমস মরিয়ার্টি (ডোনাল ফিন)! চমকে উঠবেন না, ভবিষ্যতে এই মরিয়ার্টি আর শার্লক চরম শত্রু হলেও এই সিরিজে তাঁদের সম্পর্ক শুরু হয় বন্ধুত্ব দিয়ে। এই বন্ধুত্বই সিরিজের অন্যতম আকর্ষণ—কারণ, এখানেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের সংঘাতের বীজ।
গাই রিচি স্টাইলিশ, দ্রুতগতির গল্প বলার জন্য পরিচিত। ‘ইয়ং শার্লক’-এও সেই ছাপ স্পষ্ট। ফাস্ট কাট, চটপটে সংলাপ, স্লো মোশন অ্যাকশন—সব মিলিয়ে সিরিজটি আধুনিক দর্শকের জন্য সাজানো। এটিই সিরিজটির শক্তির জায়গা। ‘ইয়ং শার্লক’ দর্শকদের নিয়ে যায় এমন দুনিয়ায় যেখানে রহস্য, পারিবারিক ড্রামা আর রসবোধ একসঙ্গে কাজ করে।
তবে মুশকিল হলো, সিরিজটিতে অনেক কিছু একসঙ্গে করার চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। আটটি পর্বের সিরিজে এতগুলো সাবপ্লট যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। কখনো সিরিজটি রহস্যের চেয়ে অ্যাকশনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। সংলাপ কখনো দীর্ঘ, কখনো তাড়াহুড়া—আর প্রতিটি দৃশ্য যেন কেবল পরবর্তী অ্যাকশন সিকোয়েন্সের জন্য প্রস্তুতি। আটটি পর্বজুড়ে একসঙ্গে চারটি দুর্বল সাবপ্লট সামলাতে হয়, যার কোনোটিই যথেষ্ট গভীর নয়।
শেষ দুই পর্বে গল্প আবার দ্রুতগতিতে এগোতে শুরু করে, একের পর এক আসা চমক দেখতে মন্দ লাগে না। তবে শার্লক কখনোই সেই আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হয়ে উঠতে পারেন না। সিরিজটিতে শার্লককে বুদ্ধির খেলায় সিদ্ধহস্ত নন বরং অ্যাকশন হিরো হিসেবে দেখা যায়। শার্লকের বিখ্যাত পর্যবেক্ষণক্ষমতা সিরিজটিতে প্রায় দেখাই যায় না। মাঝে মাঝে চেষ্টা করা হয় তার মানসিক প্রক্রিয়াগুলো ভিজ্যুয়ালাইজ করার, কিন্তু তা আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ। এসব দুর্বলতা ওয়াটসনের অনুপস্থিতির কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। ফলে মরিয়ার্টির উপস্থিতি শার্লকের তুলনায় অতিরিক্ত মনে হয়।
অভিনয়ও গড়পড়তা। তরুণ শার্লক হিসেবে হিরো ফিনিস টিফিন চলনসই। পারিবারিক জটিলতা, তরুণ বয়সের অস্থিরতা, অসহায়ত্ব ভালোভাবে সামলানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য হাফ–ব্লাড প্রিন্স’–এ তরুণ টম রিডল হিসেবে যিনি দারুণ ছাপ ফেলেছিলেন, এখানে তিনি অনেকটাই নিষ্প্রভ। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রের গভীরতা বা স্বতন্ত্রতা ফুটে ওঠে না, বরং মনে হয় তিনি শার্লকের অনুকরণ করছেন, নিজস্ব কিছু তৈরি করতে পারছেন না। তবে জেমস মরিয়ার্টি চরিত্রে ডোনাল ফিন দারুণ করেছেন। সিরিজটিতে অনেক ক্ষেত্রেই বরং শার্লকের চেয়েও উজ্জ্বল তিনি। কলিন ফারেল, নাতাশা ম্যাকেলহোনদের মতো পার্শ্ব অভিনেতারাও নিজেদের কাজটা ঠিকঠাক করেছেন।
পিরিয়ড পিস হিসেবে অবশ্য উতরে গেছে ‘ইয়ং শার্লক’। ভিক্টোরিয়ান যুগের পোশাক, অক্সফোর্ডের সময়কাল পুনর্নির্মাণ, দুর্দান্ত ভিজ্যুয়াল, সেট ডিজাইন আর মানানসই আবহসংগীতের জন্য প্রশংসা পাবেন নির্মাতারা। তাই বিরতির পর পর্দায় শার্লকের প্রত্যাবর্তন পুরোপুরি নিঁখুত না হলেও একবার দেখাই যায়।
