ভুয়া হিসাব ও দুর্বল অডিটে আস্থাহীন শেয়ারবাজার
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন, ভাঙা অডিট ব্যবস্থা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অস্থির সময় পার করেছে, যেখানে ইকোনমিক ও ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এর প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে—ভুয়া তথ্য দিয়ে কোম্পানির তালিকাভুক্তি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংক ও বাজার থেকে বিপুল অর্থ পাচারের মতো অনিয়ম বাড়ে। এমন ...
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন, ভাঙা অডিট ব্যবস্থা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অস্থির সময় পার করেছে, যেখানে ইকোনমিক ও ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এর প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে—ভুয়া তথ্য দিয়ে কোম্পানির তালিকাভুক্তি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ব্যাংক ও বাজার থেকে বিপুল অর্থ পাচারের মতো অনিয়ম বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ভালো কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দি ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এর সহযোগিতায় ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) আয়োজিত ফার সামিটের ‘নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন: আসলেই কী গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আর বিশেষ অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনলাইনে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসাইন ভূইয়া।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বিগত বছরগুলোতে একটা অস্থির সময় পার করেছে এবং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট, ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সবকিছুই মোটামুটি কাজ না করার পর্যায়ে চলে গেছে—মানে অলমোস্ট ডিসফাংশনাল ইন্সটিটিউশনগুলো। এবং যে কারণে ওয়াচডগ বডি বলেন, রেগুলেটর বলেন, মনিটরিং সিস্টেম বলেন, দুঃখজনকভাবে এসব বিষয়গুলো কাজ করে নাই বাংলাদেশে।
তিনি বলেন, ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং, অডিটিং—এই ইকোসিস্টেমটা প্রায় ভেঙে গেছে, এটা আমাদের স্বীকার করতে হবে। শুনেছি এফআরসি নাকি ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন হচ্ছে ২০২৬। আমি জানি না গত ১১ বছরে এফআরসির ভূমিকা বিগত দিনে কী ছিল। বাংলাদেশে যে ধরনের আর্থিক বিশৃঙ্খলা হয়েছে, শুধু ব্যাংকিং খাতেই হয়নি, এটা সব জায়গায় হয়েছে।
ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে শুরু করে যেখানে যাবেন—এই আর্থিক বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যাংকগুলো থেকে এতগুলো টাকা বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কোম্পানিগুলো মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে এসেছে। এ ধরনের একটা চিত্র যখন সামনে আসে, তখন কিন্তু ভালো শেয়ার অফার করতে পারে এমন কোম্পানি আসতে চাইবে না। একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে কেউ যেতে চায় না, সবাই একটা সঠিক প্রতিযোগিতায় যেতে চায়।
তিনি বলেন, প্রাইভেট খাতে ভয়াবহ মূলধন ঘাটতি আছে। এটা অনেকে বলছে না কিন্তু আমি জানি। অনেক সফল কোম্পানিও মূলধন ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরমধ্যে ব্যাংকগুলো সিরিয়াস মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। এগুলোর কারণে এনপিএল ও মানিলন্ডারিং থেকে শুরু করে টাকা বের করে নিয়ে গেছে।
ব্যাংকের মালিক বলে কিছু আছে জানা নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকে শেয়ারহোল্ডিং থাকতে পারে। কেউ ব্যাংকের মালিক না। ব্যাংকের মালিক শেয়ারহোল্ডাররা এবং ব্যাংকে টাকা রাখে ডিপোজিটররা। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ব্যাংকের মালিক দাবি করে — এই ধারনাটাই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া ওইসব মালিক দাবিকারীরা ঘরে বসে লোন ছাড় করে—এটাও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ঠিক না। এগুলো আমাদের চিন্তা করতে হবে ভবিষ্যতে।
বর্তমান সরকার স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ থাকবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবাই যার যার অবস্থান থেকে পেশাদারভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। আশা করি আইসিএবি ও আইসিএমএবি সদস্যরা, সিএফওরা সেলফ রেগুলেট করবে। এই প্রতিষ্ঠান দুটি কোম্পানির সঠিক চিত্র তুলে ধরতে দায়বদ্ধ। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাজ তো শুধু বার্ষিক সাধারন সভা (এজিএম) ও ডিনার করা না।
মন্ত্রী বলেন, এফআরসির ভূমিকা হচ্ছে জাস্ট ওভারসাইট। এফআরসি প্রতিদিন গিয়ে বলতে পারবে না যে, আপনি এখানে সম্পদ মূল্যায়ন সঠিক করেননি। এটা তো কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে সম্ভব না।
তিনি বলেন, সারাবিশ্ব থেকে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ পাচ্ছি। ফান্ড ম্যানেজাররা বড়ভাবে আসতেছে বাংলাদেশে। জেপি মরগানে আসতেছে। এছাড়া অন্যান্য বড় বিনিয়োগকারী কোম্পানিও আসতে আগ্রহী। কিন্তু আমরা কি সে পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারতেছি? এক্ষেত্রে সঠিক অ্যাকাউন্টিং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যারা এখানে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে, তাদের বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টিং ওপর তো একটা বিশ্বাস থাকতে হবে, একটা আস্থা থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা খুবই গুরুত্ব দিয়ে ক্যাপিটাল মার্কেট, ফিন্যান্সিয়াল মার্কেট ও এনবিআরে নিয়ন্ত্রণমুক্ত (ডিরেগুলেশন) করতে যাচ্ছি। যত জায়গায় আছে, আমরা কিন্তু সিরিয়াস ডিরেগুলেশনে যাচ্ছি। কিন্তু এক্ষেত্রে অডিটরদের সহযোগিতা লাগবে। ডিরেগুলেশনে গেলাম, কিন্তু অ্যাকাউন্টস ঠিক নাই, তো কোনো লাভ তো হবে না। তাই আর্থিক হিসাব সঠিক হতে হবে।
