খামখেয়ালি অডিটে বিনিয়োগকারীদের সর্বনাশ- অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : খামখেয়ালি আর্থিক প্রতিবেদন, ভুয়া অডিট ও ম্যানিপুলেটেড ভ্যালুয়েশনের কারণে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর মতে, অতীতে সঠিক নিরীক্ষা মান না মানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ শেয়ারবাজারে টাকা হারিয়েছেন। ভুয়া হিসাবের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ঋণ দেওয়ায় আর্থিক খাত দুর্বল হয়েছে এবং একই কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে ...
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : খামখেয়ালি আর্থিক প্রতিবেদন, ভুয়া অডিট ও ম্যানিপুলেটেড ভ্যালুয়েশনের কারণে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর মতে, অতীতে সঠিক নিরীক্ষা মান না মানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ শেয়ারবাজারে টাকা হারিয়েছেন। ভুয়া হিসাবের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংক ঋণ দেওয়ায় আর্থিক খাত দুর্বল হয়েছে এবং একই কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছ আর্থিক তথ্য, নির্ভরযোগ্য অডিট এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন তিনি।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দি ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এর সহযোগিতায় ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) আয়োজিত ফার সামিটের ‘নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন: আসলেই কী গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। আর বিশেষ অতিথি হিসেবে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনলাইনে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসাইন ভূইয়া।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতিতে যে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো খামখেয়ালি ও গাফিলতিতে ভর্তি। নিরীক্ষা মান মানা হয়নি, অডিট ফার্মগুলো নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়েছে, আর অ্যাকাউন্টিং মূল্যায়ন এবং অ্যাকচুয়ারি সার্ভিস অনেক ক্ষেত্রে আইনের বাইরে থেকে গেছে।
তিনি বলেছেন, আমরা জানি কীভাবে পুরো অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে ফেলা হয়েছে এবং সেগুলো আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়েছি। বিশেষ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়েছে। ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হাজার হাজার মানুষ শেয়ারবাজারে টাকা হারিয়েছে। পরে দেখা গেছে যে সেই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা একেবারেই অন্যরকম। শেয়ারের দাম পড়ে গেছে, বিনিয়োগকারীরা এক অনির্বচনীয় দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে।
তিনি বলেন, আমরা জানি যে ব্যাংক এবং আর্থিক খাত কীভাবে দুর্বল করা হয়েছে। ভুয়া ভ্যালুয়েশন অথবা আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংক বড় বড় ঋণ দিয়েছে, পরে ঋণ খেলাপি হয়েছে, ব্যাংক পড়েছে সংকটে। এবং একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। সবচেয়ে দুর্ভোগের বিষয় হচ্ছে যে এ কারনে সৎ উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে উদ্যোক্তা সত্যিকারের আর্থিক অবস্থা দেখিয়েছে, তার কাছে বিনিয়োগকারী আসতে পারেনি, কারণ অসৎ প্রতিযোগীরা বেশি বেশি লাভ দেখিয়ে বিনিয়োগ খাতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। যে বেশি মিথ্যা বলেছে সে বেশি টাকা হাতিয়েছে এবং তার মাধ্যমে লুটপাট করেছে।
আর সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই পরিস্থিতিতে এক ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে বলে জানান তিতুমীর। তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে খুবই দুর্ভাগ্যজনক বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়নি এবং বড় বড় ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) সেই কারণেই আসেনি, কারণ তারা জানে যে আমাদের যে হিসাব ব্যবস্থাগুলো সেগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য।
তিনি বলেন, আমি যদি কাউকে টাকা দেই, তাহলে জানতে চাইব তার ব্যবসার অবস্থা আসলে কেমন। সেই তথ্যই দেয় আর্থিক প্রতিবেদন, অডিট ভ্যালুয়েশন ও অ্যাকচুয়ারি রিপোর্ট। তো তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা দেখতে চাই যে অডিট ফার্মগুলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্ববোধ থেকে বিনিয়োগকারী এবং অন্যদেরকে সেই তথ্য সরবরাহ করবে।
এই উপদেষ্টা বলেন, আমরা জানি যে ভ্যালুয়েশন এবং অ্যাকচুয়ারি সেবায় শৃঙ্খলা আনা কতটা জরুরি। কারণ সম্পদের প্রকৃত মূল্য না জানলে লোন দেয়া এবং বিনিয়োগ করা দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বিদেশি বিনিয়োগ যদি আমরা আকর্ষণ করতে চাই, তাহলে অডিট ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার।
তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত ভুল আর্থিক প্রতিবেদন, ভুয়া অডিট রিপোর্ট, ম্যানিপুলেটেড ভ্যালুয়েশন—এগুলোর বিরুদ্ধে যাতে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে আহ্বান করেন। অডিট ফার্ম, হিসাবরক্ষক, মূল্যায়নকারী, অ্যাকচুয়ারি—কেউ ভুল করলে আজকের সভা থেকে একটা বড় রকমের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এছাড়া এফআরসিকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত করা হলে নিশ্চয়ই সুশাসনের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
বর্তমান সরকারের আস্থার বাজার গড়ার অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের যে ভঙ্গুর অর্থনীতি, সেই অর্থনীতি থেকে সমৃদ্ধির পথে যেতে চাই। বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে পারে। বিশ্বের দরবারে যদি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং ভিতকে শক্ত করতে হবে। ভিত তখনই শক্ত হবে যদি স্বচ্ছ আর্থিক তথ্য, নির্ভরযোগ্য অডিট এবং মূল্যায়ন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা থাকে।
