পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (৯ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসছে :
বোর্ড সভায় দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ...
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়া পাঁচটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (৯ জুন) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসছে :
বোর্ড সভায় দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা মোট নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—
এফএএস ফাইন্যান্স
ফারইস্ট ফাইন্যান্স
আভিভা ফাইন্যান্স
পিপলস লিজিং
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্স—এই চারটি প্রতিষ্ঠানকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
আমানত ফেরত ও অবসায়ন প্রক্রিয়া :
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসক বসানো পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। প্রথম ধাপে এসব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
তিন মাস সময় পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ সময়ের মধ্যে ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। ব্যর্থ হলে সেগুলোকেও অবসায়ন বা রেজুলেশন প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে।
ভয়াবহ খেলাপি ঋণের চিত্র :
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে—
এফএএস ফাইন্যান্সে খেলাপি ঋণ: ৯৯.৯৯%
ফারইস্ট ফাইন্যান্স: ৯৮.৫০%
আভিভা ফাইন্যান্স: ৯৩.৯৩%
পিপলস লিজিং: প্রায় ৯৫%
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৯৯.৪৪%
এর আগে উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও আমানত ফেরতে ব্যর্থতার কারণে গত বছর এই নয়টি প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
সরকারের ব্যয় ও আমানতের চিত্র :
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে সরকারের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। সংকটে থাকা নয়টি প্রতিষ্ঠানে মোট ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের এবং বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।
সবচেয়ে বেশি ব্যক্তি আমানত আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
আইনগত ভিত্তি ও খাতের সার্বিক অবস্থা :
২০২৩ সালে প্রণীত ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন’ অনুযায়ী, আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম, সম্পদের ঘাটতি ও মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে মোট ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের ৮৩ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির প্রভাবেই এনবিএফআই খাতের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
