ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি ৫২৫ টাকার লোকসান গোপন
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ–এ ঋণের নামে গ্রাহকদের আমানতের বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে এসেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের মাধ্যমে দেওয়া ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে করে ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকটির গ্রাহকদের আমানত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেখা গেছে, ঋণের নামে টাকা আত্মসাতের কারনে ব্যাংকটির ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে ৮৪ হাজার কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৫২৫) টাকা লোকসান হয়েছে। ...
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ–এ ঋণের নামে গ্রাহকদের আমানতের বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা সামনে এসেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের মাধ্যমে দেওয়া ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে করে ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং ব্যাংকটির গ্রাহকদের আমানত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেখা গেছে, ঋণের নামে টাকা আত্মসাতের কারনে ব্যাংকটির ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে ৮৪ হাজার কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৫২৫) টাকা লোকসান হয়েছে। তবে এ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই বছরের ব্যবসায় ১৩৭ কোটি টাকা বা শেয়ারপ্রতি ০.৮৫ টাকা মুনাফা দেখিয়েছে।
ব্যাংকটির ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এ খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে গ্রাহকদের স্বল্পমেয়াদি আমানতকে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিয়ে থাকে। এটা খুবই বাজে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এর উপরে আবার রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক দখল করে এস.আলমদের মতো চক্র অস্তিত্বহীন ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যার মাধ্যমে গ্রাহকদের আমানতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এদের কারনে এখন অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত দিতে পারছে না। যাতে আমানতকারীরা এখন অসহায়ের মতো ঘুরছে।
ইসলামী ব্যাংকের ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি ০.৮৫ টাকা করে নিট মুনাফা দেখানো হয়েছে ১৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর নিট সম্পদ ৭ হাজার ১৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি নিট ৪৪.৫২ টাকা সম্পদ দেখানো হয়েছে।
তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ (ঋণ) দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, যা মোট বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি। এই বিপুল খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) হওয়া উচিত ছিল ৮৮ হাজার ৮৯৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকটি সঞ্চিতি গঠন করেছে মাত্র ৫ হাজার ৮৮৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ফলে শুধুমাত্র এই খাতেই সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ১১ কোটি ৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে মোট প্রয়োজনীয় সঞ্চিতির দরকার ছিল ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটি সঞ্চিতি গঠন করেছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ফলে বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে মোট সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
এই বিপুল সঞ্চিতি ঘাটতি স্বীকৃতি না দেওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীতে সম্পদ, নিট মুনাফা ও ইক্যুইটি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে দায় কম দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকটির অপর্যাপ্ত মুনাফার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তীতে এই সঞ্চিতি গঠনের সুযোগ দিলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের ছাড় আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ ভবিষ্যতে এই বিশাল অঙ্কের সঞ্চিতি একসঙ্গে গঠন করতে হবে, যার প্রকৃত প্রভাব বর্তমান আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হয়নি। এতে করে বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, যা এক ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হিসাব মান অনুযায়ি ব্যাংকটির ২০২৫ সালে আরও ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করা দরকার ছিল। যা করা হলে ব্যাংকটির ওই বছরে ৮৪ হাজার ৪৭৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি (৫২৫) টাকা লোকসান হতো।
এদিকে ওই প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ২০২৫ সালে গঠন করা হলে ব্যাংকটির নিট সম্পদ ৭ হাজার ১৬৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৭৭ হাজার ৪৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় বা শেয়ারপ্রতি সম্পদ ৪৪.৩৬ টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক (৪৮১) টাকায় নেমে আসতো।
এই মন্দাবস্থার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুকূল্য বিবেচনায় ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনা করা হুমকির মুখে পড়তে হবে বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ব্যাসেল-৩ এর শর্ত পূরণে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় মূলধনের দরকার ছিল ১৯ হাজার ২০০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে ব্যাংকটির রয়েছে ৯ হাজার ৮৫৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার ৩৪৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তবে ৮৪ হাজার ৬১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি বিবেচনায় নিলে মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৯৬০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, ব্যাসেল-৩ এর শর্ত পূরণের জন্য ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ১২.৫০% দরকার। তবে ব্যাংকটির আছে মাত্র ৬.৪২%।
ব্যাংকের একক কোনো ঋণগ্রহীতা বা একটি গ্রুপের প্রতি মোট এক্সপোজার (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড মিলিয়ে) তার মোট মূলধনের ২৫%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫% ফান্ডেড এবং ১০% নন-ফান্ডেড এক্সপোজার অনুমোদিত। তবে ইসলামী ব্যাংকের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী এবং আর্থিক বিবরণীর নোট নং ১১.৬–এ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে যে, একাধিক ক্ষেত্রে ব্যাংকের এক্সপোজার উল্লিখিত নিয়ন্ত্রক সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে অতিক্রম করেছে।
এস আলমের লুটপাটে দূর্বল হয়ে পড়া ইসলামী ব্যাংক থেকে আর্থিকভাবে দুর্বল কয়েকটি ব্যাংকের সাবঅর্ডিনেটেড ঋণ উপকরণে মোট ৮৪৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি। চলমান ব্যাংকিং খাত সংস্কার উদ্যোগের আওতায় এসব ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) করা হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এসব বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক ২০২৪ সালের আর্থিক হিসাবে জানায়, এই ঋণগুলির মধ্যে অনেকগুলি আসলে আগেই খেলাপি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিরীক্ষক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করে। আর তারা প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ উদ্ধার করেছে। অতএব, বর্তমানে ব্যাংকের ব্যবসা পরিচালনায় কোনও হুমকি নেই।
উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১ হাজার ৬০৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এরমধ্যে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতিত) বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৯৯.৮২ শতাংশ। কোম্পানিটির মঙ্গলবার (২ জুন) শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ৩২.৬০ টাকায়।
