২০২৫-২৬ অর্থবছর সব সূচকে এগিয়েছে শেয়ারবাজার
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও মন্দাভাব কাটিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রধান মূল্যসূচক, লেনদেন, বাজারমূলধন, শেয়ার হাতবদল, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং মোবাইল ট্রেডিং—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্লক মার্কেট, সরকারি সিকিউরিটিজ (জি-সেক), অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং এসএমই মার্কেটেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। তবে জিডিপির তুলনায় বাজারের আকার কমে যাওয়া এবং নতুন সিকিউরিটিজের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া বাজারের ...
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও মন্দাভাব কাটিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রধান মূল্যসূচক, লেনদেন, বাজারমূলধন, শেয়ার হাতবদল, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং মোবাইল ট্রেডিং—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্লক মার্কেট, সরকারি সিকিউরিটিজ (জি-সেক), অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং এসএমই মার্কেটেও মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। তবে জিডিপির তুলনায় বাজারের আকার কমে যাওয়া এবং নতুন সিকিউরিটিজের সংখ্যা হ্রাস পাওয়া বাজারের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের 'মার্কেট সামারি'তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সূচকে বড় প্রত্যাবর্তন
প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স অর্থবছরের শুরুতে ছিল ৪ হাজার ৮৩৮ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট। বছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৬২ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। অর্থাৎ এক বছরে সূচক বেড়েছে ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে সূচক ৯ দশমিক ২০ শতাংশ কমেছিল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বাজারে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস৩০-ও ১৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮১৫ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট থেকে ২ হাজার ১৭৮ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ১০ দশমিক ১২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ১৬৮ দশমিক ১৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
বাজার মূলধনে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রবৃদ্ধি
অর্থবছরের শুরুতে তালিকাভুক্ত সব সিকিউরিটিজের বাজারমূলধন ছিল ৬৬ লাখ ২২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে বাজারমূলধন বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা (৩৬৪.২১ বিলিয়ন টাকা), যা শতাংশের হিসাবে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। সরকারি ট্রেজারি বন্ড বাদ দিলে বাজারমূলধন বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।
লেনদেনে বড় উল্লম্ফন
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৮৯৪ মিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। দৈনিক গড় লেনদেনও ৪ হাজার ৭২৫ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ২২৬ মিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে।
শেয়ার হাতবদলের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক বছরে মোট লেনদেন হওয়া শেয়ারের সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৯৪ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ৫৯ হাজার ৩৩১ মিলিয়নে পৌঁছেছে, যা ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
ব্লক মার্কেটেও প্রবৃদ্ধি
ব্লক মার্কেটে মোট লেনদেন ৬৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ৭১ হাজার ২৯৪ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। যদিও মোট লেনদেনে ব্লক মার্কেটের অংশ ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে।
মোবাইল ট্রেডিংয়ে রেকর্ড বৃদ্ধি
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরও বেড়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ এক বছরে ৭৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৫ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। মোট লেনদেনে মোবাইল ট্রেডিংয়ের অংশও ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ হয়েছে।
বিদেশিদের অংশগ্রহণ বেড়েছে
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ৩৯ হাজার ৪১৪ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ৪৯ হাজার ৪৩১ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধিকে বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সিকিউরিটিজ (জি-সেক) বাজারেও উন্নতি
সরকারি সিকিউরিটিজ বা জি-সেক বাজারে মোট লেনদেন ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৬০১ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও সামগ্রিক লেনদেনে এ বাজারের অংশ এখনও খুবই সীমিত, মাত্র শূন্য দশমিক ০৯ শতাংশ।
এসএমই বাজারে মিশ্র চিত্র
এসএমই প্ল্যাটফর্মে মোট লেনদেন ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার ৯৩ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে এসএমই ব্লক মার্কেটে লেনদেন ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮০ মিলিয়ন টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গঠিত এই বাজারে এখনও প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
এটিবিতে লেনদেনে বড় উল্লম্ফন
অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ডে (এটিবি) মোট লেনদেন ৪০ দশমিক ৯২ মিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ৭১ দশমিক ১৩ মিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। যদিও লেনদেনের পরিমাণ এখনও খুবই সীমিত, তবে এটিবির কার্যক্রম ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বাজার এখনও তুলনামূলক সস্তা
অর্থবছর শেষে বাজারের গড় প্রাইস-আর্নিং (পিই) অনুপাত ৯ দশমিক ২৬, যা আগের বছরের ৯ দশমিক ৩৪ থেকে সামান্য কম। কম পিই অনুপাতের কারণে বাজার এখনও তুলনামূলক আকর্ষণীয় মূল্যায়নে রয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
জিডিপির তুলনায় বাজারের আকার কমেছে
সব ইতিবাচক সূচকের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক হলো—দেশের জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের আকার আরও ছোট হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজারমূলধন জিডিপির ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ ছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির তুলনায় পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
কমেছে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ
অর্থবছরে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের সংখ্যা ৬৫৫ থেকে কমে ৬৪০-এ নেমেছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড ৩৭ থেকে ৩৬-এ এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ড ২৩৪ থেকে ২২০-এ নেমে এসেছে। কোম্পানি ও করপোরেট বন্ডের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে।
লেনদেন কমলেও কর আদায়ে বড় অবদান
ডিএসইর লেনদেনের ওপর উৎসে কর (আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৩৭ ধারা) বাবদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার পেয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে এ অঙ্ক ছিল প্রায় ১০৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এছাড়া আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৩৫ ধারা অনুযায়ী ডিএসই ৪২ কোটি ২ লাখ টাকার কর পরিশোধ করেছে, যা আগের অর্থবছরের ৫৮ কোটি ৩ লাখ টাকা থেকে কম।
