শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ উত্তোলনের পর একের পর এক কোম্পানির দুর্বল পারফরমেন্স এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এর এক পরিচালক জানান, আগের দুটি কমিশনের সময়ে কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে বহু কোম্পানিকে আইপিওর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল—যার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়ত উল ইসলাম-এর নেতৃত্বাধীন সেই কমিশন ...

শেয়ারবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ উত্তোলনের পর একের পর এক কোম্পানির দুর্বল পারফরমেন্স এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-এর এক পরিচালক জানান, আগের দুটি কমিশনের সময়ে কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে বহু কোম্পানিকে আইপিওর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল—যার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানো হলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়ত উল ইসলাম-এর নেতৃত্বাধীন সেই কমিশন আমলে প্রিমিয়ামে অর্থ উত্তোলনের পর তসরিফার মুনাফা কমেছে, ঋণ ও সুদ ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে আইপিওর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

প্রিমিয়ামে অর্থ উত্তোলন :

ইস্যু ম্যানেজার আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টসের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা উত্তোলন করে তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ। ওইসময় প্রতিটি শেয়ারে ১৬ টাকা প্রিমিয়ামসহ ২৬ টাকা করে সংগ্রহ করে। কিন্তু সেই কোম্পানি সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দেয়। যা ইস্যু মূল্য বিবেচনায় ১.৫৪ শতাংশ। অথচ যেকোন ব্যাংকে এফডিআর করলে কমপক্ষে ১০ শতাংশ নিশ্চিত পাওয়া যেত।

আইপিও ফান্ডের ব্যবহার :

তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসা সম্প্রসারণে ২০১৫ সালে শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলন করা ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মধ্যে ৬১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা দিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে মেশিনারীজ ক্রয় ও ১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা দিয়ে আইপিও ব্যয় পরিচালনা করার কথা জানিয়েছিল। তারপরেও শেয়ারবাজারে আসার পরে ব্যবসায় নিম্নমূখী এ কোম্পানিটির পারফরমেন্স।

আইপিওর পরে ইপিএস ও মুনাফায় পতন :

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে ২০১৩ তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারপ্রতি ২.৬৪ টাকা করে নিট ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মুনাফা হয়েছিল। সেই কোম্পানির সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ০.৭৫ টাকা করে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে।

মুনাফা বাড়াতে শেয়ারবাজারে আসা এ কোম্পানিটির শেষ ৩ অর্থবছরে আইপিওকালীন বা ২০১৩ সালের থেকে কম মুনাফা হয়েছে। এরমধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ১.০৪ টাকা করে ৭ কোটি ৮ লাখ টাকার মুনাফা হয়। যা কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হয় শেয়ারপ্রতি ০.৭৩ টাকা করে ৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

মুনাফার এই নিম্নমূখী ধারাবাহিকতা ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অব্যাহত আছে। কোম্পানিটির আগের অর্থবছরের ৯ মাসের ০.৪৭ টাকার শেয়ারপ্রতি মুনাফা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একইসময়ে নেমে আসে ০.২৫ টাকায়।

আইপিওর আগে উত্থান :

এই কোম্পানিটিরই শেয়ারবাজারে আসার আগের ৫ অর্থবছরে টানা মুনাফা বেড়েছিল। দেখা গেছে, ২০০৯ সালের শেয়ারপ্রতি ২.৪৬ টাকা করে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছিল। যা ২০১৩ সালে বেড়ে হয়েছিল শেয়ারপ্রতি ২.৬৪ টাকা করে ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ওইসময় ৪ বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছিল ৬.৮৭ কোটি টাকা বা ৩৯৯ শতাংশ।

শেয়ারবাজারে এসে ঋণ গ্রহন :

আইপিওতে বড় অর্থ উত্তোলনের পরেও ব্যবসায় তসরিফার মন্দা। এরমধ্যে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে কোম্পানিকে আরও চাঁপে ফেলেছে। এই ঋণের কারণে আয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ব্যাংকের পকেটে।

দেখা গেছে, প্রসপেক্টাস অনুযায়ি কোম্পানিটির শেয়ারবাজারে আসার আগে ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮.০৪ কোটি টাকা। যা ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দাঁড়িয়েছে ২০৪.০৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৮৬.০৫ কোটি টাকা বা ১০৩১ শতাংশ।

এই ঋণ বৃদ্ধিতে কোম্পানিটির আইপিও পূর্ব ২০১৩ সালের ২.৯৫ কোটি টাকার সুদজনিত ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ২৪.১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটির আইপিও পরবর্তী সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে ২১.১৫ কোটি টাকা বা ৭১৬ শতাংশ।

এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব হায়দার আলীকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া মেইল করেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি।