শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের মুনাফার তথ্য প্রকাশে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির সমন্বিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৮৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমন্বিত মুনাফার পরিবর্তে একক আর্থিক হিসাবের ৯০১ কোটি টাকা মুনাফার তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এতে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি মুনাফার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক ...

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের মুনাফার তথ্য প্রকাশে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির সমন্বিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ৮৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমন্বিত মুনাফার পরিবর্তে একক আর্থিক হিসাবের ৯০১ কোটি টাকা মুনাফার তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এতে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পরিবর্তে তুলনামূলক বেশি মুনাফার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটে সমন্বিত আর্থিক বিবরণীতে। কারণ, এতে মূল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তার সব সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, মুনাফা বা লোকসানের সম্মিলিত চিত্র উঠে আসে। অন্যদিকে একক আর্থিক বিবরণীতে কেবল মূল প্রতিষ্ঠানের হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডারদের কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক চিত্র উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সমন্বিত হিসাবই গ্রহণযোগ্য।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে সমন্বিত আর্থিক তথ্যই প্রধানভাবে প্রকাশ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে সমন্বিত হিসাবের পাশাপাশি একক হিসাবও প্রকাশ করা হয়। তবে সমন্বিত তথ্য বাদ দিয়ে শুধু একক হিসাব প্রকাশের নজির নেই। কারণ সমন্বিত আর্থিক বিবরণীকেই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্যদিকে একই খাতের অন্যান্য ব্যাংক তাদের বার্ষিক ফলাফলের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমন্বিত মুনাফার তথ্যই প্রকাশ করেছে। কিন্তু ইস্টার্ন ব্যাংক নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি দেখাতে একক হিসাবের মুনাফাকে সামনে এনেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৫ অর্থবছরে ইস্টার্ন ব্যাংকের কর-পরবর্তী মুনাফা ২০ শতাংশ বেড়ে ৯০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে ব্যাংকটির নিরীক্ষিত সমন্বিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী একই সময়ে প্রকৃত সমন্বিত মুনাফা ছিল ৮৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমন্বিত ফলাফলের পরিবর্তে একক হিসাবের বেশি মুনাফার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের শতভাগ মালিকানাধীন চারটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হলো— ইবিএল সিকিউরিটিজ, ইবিএল ইনভেস্টমেন্ট, ইবিএল ফ্রান্স এবং ইবিএল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট। সমন্বিত আর্থিক বিবরণীতে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা লোকসানও অন্তর্ভুক্ত থাকে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ফল মূল ব্যাংকের একক মুনাফাকে কমিয়ে দেওয়ায় সেই সমন্বিত তথ্য আড়াল করে শুধু একক হিসাবের ৯০১ কোটি টাকার মুনাফা প্রচার করা হয়েছে।

আর্থিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, একটি কোম্পানি যখন অন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ধারণ করে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বা লোকসানও মালিকানার অনুপাতে মূল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলের অংশ হয়ে যায়। তাই সাবসিডিয়ারির ফলাফল বাদ দিয়ে কেবল মূল প্রতিষ্ঠানের মুনাফা প্রচার করলে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এসিআই পিএলসি মূল ব্যবসায় ভালো মুনাফা করলেও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে রয়েছে। যদি এসিআই স্বপ্নের আর্থিক ফলাফল বাদ দিয়ে শুধু মূল কোম্পানির মুনাফার তথ্য প্রচার করত, তাহলে সেটিও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতো এবং বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত।

এ ধরনের তথ্য উপস্থাপনকে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার শামিল বলে মনে করেন। বিএসইসির সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হতে পারে। এছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ (প্রতারণামূলক কার্যক্রম) বিধিমালা, ২০২২-এ মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করাকে প্রতারণামূলক কার্যক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তদন্ত পরিচালনা, জরিমানা, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, পরিচালকদের অযোগ্য ঘোষণা এবং প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলাও করতে পারে।

এসব বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা জিয়া সাহেবের সঙ্গে আলাপ করতে বলেন। এরপরে জিয়া সাহবেকে একাধিকবার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি এবং ম্যাসেজ দিলেও জবাব দেননি।