অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজার থেকে ১২ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য রয়্যাল ফুটওয়্যারের কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার (কিউআইও) অনুমোদন করেছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে একাধিক অসঙ্গতি ও প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য সামনে আসায় সেই কিউআইও বাতিল হওয়ার পথে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় কিউআইওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন পায় রয়্যাল ফুটওয়্যার। তবে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক হিসাব ...

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজার থেকে ১২ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য রয়্যাল ফুটওয়্যারের কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার (কিউআইও) অনুমোদন করেছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তবে কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে একাধিক অসঙ্গতি ও প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য সামনে আসায় সেই কিউআইও বাতিল হওয়ার পথে। একই সঙ্গে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

গত ১৪ জুলাই বিএসইসির ১০২০তম কমিশন সভায় কিউআইওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন পায় রয়্যাল ফুটওয়্যার। তবে পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। ডিএসইর এক পরিচালক জানান, বিএসইসি চেয়ারম্যান কোম্পানিটির আর্থিক হিসাব নিয়ে ক্ষুব্ধ এবং কিউআইও বাতিলের পাশাপাশি বড় ধরনের শাস্তির বিষয়েও তিনি কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।

ডিএসইর ওই পরিচালক আরও বলেন, রয়্যাল ফুটওয়্যার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির যোগ্য নয়। এ কারণে ডিএসই তাদের আবেদন বাতিল করেছিল। পরে কোম্পানিটি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের উদ্যোগ নেয় এবং প্রায় অনুমোদনের পর্যায়েও চলে গিয়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে বিষয়টি বিএসইসি চেয়ারম্যানের নজরে আসে।

নগদ অর্থ রেখেও ঋণ শোধে কিউআইও

রয়্যাল ফুটওয়্যার কিউআইওর মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। এর মধ্যে ২ কোটি টাকা কাঁচামাল কেনা, ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা স্পেয়ার পার্টস, ৮ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং ৩৩ লাখ টাকা কিউআইও-সংক্রান্ত ব্যয়ে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু কোম্পানিটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর তাদের হাতে নগদ ও নগদ সমমানের সম্পদ ছিল ২০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর আগের বছরের ৩০ জুনও এই পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধের মতো পর্যাপ্ত নিজস্ব নগদ অর্থ থাকার পরও শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করেছে কোম্পানিটি।

বিক্রির তুলনায় অস্বাভাবিক মজুদ

কোম্পানিটির মজুদ পণ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর মোট মজুদের পরিমাণ ছিল ৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে কাঁচামালই ছিল ৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এরপরও কিউআইও থেকে আরও ২ কোটি টাকার কাঁচামাল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। বিপরীতে মজুদ ছিল ৫০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা ছয় মাসের বিক্রির প্রায় ৯৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে ৯২ কোটি ২৪ লাখ টাকার বিক্রির বিপরীতে মজুদ ছিল ৬১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বা বিক্রির প্রায় ৬৭ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, বিক্রির তুলনায় অতিরিক্ত মজুদ কার্যকরী মূলধনের ওপর চাপ বাড়ায় এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি তৈরি করে। অথচ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বিক্রির বিপরীতে কোম্পানিটির মজুদ ছিল মাত্র ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

কোম্পানি সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন বলেন, ইডিএফ ঋণের মেয়াদ ৯০ দিন হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা যায়। পাশাপাশি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল মজুদ রাখতে হয়।

তবে ডিএসইর এক পরিচালক এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে এত বড় মজুদ থাকার কথা নয়। একইভাবে ২০ কোটির বেশি নগদ অর্থ হাতে রেখে ঋণ পরিশোধের জন্য শেয়ারবাজারে আসার যৌক্তিকতাও তিনি দেখছেন না।

কিউআইওতে কমবে উদ্যোক্তাদের সম্পদমূল্য

নতুন শেয়ার ইস্যুর ফলে রয়্যাল ফুটওয়্যারের বিদ্যমান উদ্যোক্তা, পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের সম্পদের মূল্যও কমে যাবে। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ২৭ টাকা ৫৪ পয়সা। কিউআইও-পরবর্তী সময়ে অভিহিত মূল্যে নতুন শেয়ার ইস্যু হলে তা কমে ২২ টাকা ৫৯ পয়সায় দাঁড়াবে।

এতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ারপ্রতি ৪ টাকা ৯৫ পয়সা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মোট প্রায় ১৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকার সম্পদমূল্য কমবে বলে হিসাব করা হয়েছে।

ঋণ প্রায় পরিশোধিত মূলধনের দ্বিগুণ

কোম্পানিটির আকার তুলনামূলক ছোট হলেও ঋণের পরিমাণ বড়। ৩৩ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকঋণ ছিল ৫৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা পরিশোধিত মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ।

লাভজনকতার দিক থেকেও কোম্পানিটি খাতের গড়ের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুতা শিল্পে গড় রিটার্ন অন ইক্যুইটি (আরওই) ছিল ১১ দশমিক ২১ শতাংশ। একই সময়ে রয়্যাল ফুটওয়্যারের আরওই ছিল ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে খাতের গড় ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশের বিপরীতে কোম্পানিটির আরওই ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।

আর্থিক হিসাবেও অসঙ্গতির অভিযোগ

কোম্পানিটির আর্থিক বিবরণীতে ঋণের হিসাব নিয়েও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ব্যালেন্স শিট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বল্পমেয়াদি ঋণ বেড়েছিল ২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং পরবর্তী ছয় মাসে কমেছিল ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অথচ নগদ প্রবাহ বিবরণীতে একই সময়ে নতুন ঋণ গ্রহণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৯৪ লাখ টাকা এবং ঋণ পরিশোধ ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

কোম্পানি সচিবের ব্যাখ্যা, ঋণের একটি অংশ অপারেটিং কার্যক্রমে এবং অন্য অংশ ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমে দেখানো হয়েছে। তবে কেন ঋণ অপারেটিং কার্যক্রমে দেখানো হয়েছে এবং সেই ঋণের সুদ কীভাবে ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমে গেছে—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের উদাহরণ

এসএমই প্ল্যাটফর্ম থেকে ২০২৩ সালে কিউআইওর মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল আল-মদিনা ফার্মাসিউটিক্যালস। ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সুদ ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নিয়ে বাজারে এলেও তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স দুর্বল হয়েছে। একই সময়ে লক-ইন মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিন উদ্যোক্তা-পরিচালক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন।

কিউআইওর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে আল-মদিনার নিট মুনাফা ছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং ইপিএস ১ টাকা ৩০ পয়সা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুনাফা কমে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ইপিএস ৫৮ পয়সায় নেমে আসে। একই সময়ে বিক্রি ৬৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা থেকে কমে ৪৮ কোটি ১৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, কিউআইওর আগে আল-মদিনার বিক্রি ও মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ লাখ টাকা লোকসান করা কোম্পানিটি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা মুনাফা করে। একই সময়ে বিক্রি ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ কোটি ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছায়।

রয়্যাল ফুটওয়্যারের আর্থিক চিত্র

রয়্যাল ফুটওয়্যারের বিক্রি ও মুনাফাতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির বিক্রি ছিল ৫৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯২ কোটি ২৪ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ চার বছরে বিক্রি বেড়েছে ৩৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা বা প্রায় ৬৮ শতাংশ।

একই সময়ে নিট মুনাফা ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, অর্থাৎ চার বছরে বেড়েছে প্রায় ১৮৮ শতাংশ।

সম্পদ ও অবচয় নিয়েও প্রশ্ন

রয়্যাল ফুটওয়্যারের খসড়া প্রসপেক্টাসে ভবন নির্মাণ, অবচয়, জমি উন্নয়ন ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হিসাব নিয়েও অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। এসবের মাধ্যমে কোম্পানিটির সম্পদ, মুনাফা, রিটেইনড আর্নিংস এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএসইসি।

প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের ভবন নির্মাণে জমির মূল্য বাদে ১৪ কোটি ৯৪ লাখ ৯০ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ হাজার ২০৮ টাকা। ২০০৮ সালের ভবনে প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ২৫৪ টাকা এবং ২০২১ সালের ভবনে ১ হাজার ৭৫৪ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভবন খাতে কোম্পানিটির সম্পদ ছিল ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে এ পর্যন্ত অবচয় চার্জ করা হয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কোম্পানির নির্ধারিত ৫ শতাংশ ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতি অনুযায়ী হিসাব করলে তিনটি ভবনের মোট অবচয় হওয়ার কথা ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা কম অবচয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

পেশাদার হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, জমি ছাড়া যেকোনো স্থায়ী সম্পদ ব্যবহার উপযোগী হওয়ার পর থেকেই অবচয় হিসাব করতে হয়।

এ ছাড়া ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় কেনা জমির উন্নয়ন বাবদ ৫৪ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৪ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হিসাবেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে নিট আয়ের ৫ শতাংশ দিয়ে এ তহবিল গঠন ও বিতরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোম্পানিটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তহবিল গঠন করলেও তা বিতরণ করেনি। এতে কয়েক বছরে প্রায় ৩২ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা দেখানো হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে কোম্পানি সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন দাবি করেছেন, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই অবচয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবন নির্মাণ ব্যয়ও সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, “কমিশন বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”