বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল) মূল ব্যাংকিং ব্যবসায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। ঋণ ও আমানতনির্ভর আয়ের জায়গায় পতন হলেও বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয়ের জোরে মুনাফা ধরে রেখেছে ব্যাংকটি—এমন চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে। ব্যাংকটির এমনই অবস্থা যে, পরিচালন ব্যয়ের ৮০ শতাংশও আসে না মূল ব্যবসা থেকে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ইবিএলের নিট সুদ আয় ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৮৩ ...

বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল) মূল ব্যাংকিং ব্যবসায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। ঋণ ও আমানতনির্ভর আয়ের জায়গায় পতন হলেও বিনিয়োগ ও অন্যান্য আয়ের জোরে মুনাফা ধরে রেখেছে ব্যাংকটি—এমন চিত্র উঠে এসেছে ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে। ব্যাংকটির এমনই অবস্থা যে, পরিচালন ব্যয়ের ৮০ শতাংশও আসে না মূল ব্যবসা থেকে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ইবিএলের নিট সুদ আয় ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৮৩ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে নিট সুদ আয় কমেছে ৭৫ কোটি ২১ লাখ টাকা বা ৭ শতাংশ। যা মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমে দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংকটি ঋণ কার্যক্রমের বদলে বিনিয়োগ আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, প্রাইজ বন্ড ও বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালে যেখানে মোট বিনিয়োগ ছিল ১৪ হাজার ৩০৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ১৪৭ কোটি ৩১ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে ৬ হাজার ৮৪২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বা ৪৮ শতাংশ।

এর ফলে বিনিয়োগ আয়ও লাফিয়ে বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ১ হাজার ১৭ কোটি ৮ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫৩ কোটি ৫ লাখ টাকায়। এক বছরে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৪৩৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বা ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটি কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ থেকে আয় করেছে ৬১২ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং অন্যান্য পরিচালন খাত থেকে আয় করেছে ৪৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এসব আয়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকটি মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

আরও পড়ুন...

ইস্টার্ন ব্যাংকের মুনাফা নিয়ে প্রতারণা

২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৭৫০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০০ কোটি ৯৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে মুনাফা বেড়েছে ১৫০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বা ২০ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ ও অন্যান্য পরিচালন আয় বাদ দিলে ব্যাংকটি কার্যত লোকসানে পড়ত। কারণ ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ছিল ৯৮৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা, অথচ একই বছরে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে বেতনাদিবাবদই ব্যয় হয়েছে ৭৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। ব্যাংকটির এর বাহিরেও অনেক ব্যয় রয়েছে। যাতে ২০২৫ সালে বেতনাদিসহ ব্যাংকটির মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ব্যয় যোগ হয়েছে আরও ৪৩৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এদিকে ইবিএল থেকে দেশের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানিতে রাখা ১ হাজার ১৫২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মধ্যে একটি অংশ গেছে আর্থিকভাবে দুর্বল ও সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানে। এরমধ্যে ২০২৫ সালে ব্যাংকটি থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে (এক্সিম ব্যাংক) ১৭১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, এনআরবি ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা এফডিআর করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন ক্যাপিটালে ২৪ কোটি টাকা টাকা রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর ইবিএলের পরিশোধিত মূলধন ছিল ১ হাজার ৫৯৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং নিট সম্পদ ছিল ৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকার। ব্যাংকটি থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৪৪৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ৫৫ হাজার ৬৪৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। এরমধ্যে ৩০ হাজার ৩০১ কোটি ৬ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে।

এ ব্যাংকটির ২০২০ সালে ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৪১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং আমানত ছিল ২৪ হাজার ২৩৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ওইসময় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৩৯৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

এ হিসাবে ৫ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ৩১ হাজার ৪০৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা বা ১৩০ শতাংশ। তবে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৬ হাজার ২৭ কোটি ৫ লাখ টাকা বা ৭৫ শতাংশ। বিপরীতে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে ১৪ হাজার ৭৫২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ২৩১ শতাংশ।