শেয়ারবাজারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের পরও প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ায় এস্কয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড–এর আর্থিক সক্ষমতা ও আইপিও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইস্যু ম্যানেজার প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট–এর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হলেও আইপিও–পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা, লভ্যাংশ ও শেয়ারদরে ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। আইপিওর আগে টানা মুনাফা বৃদ্ধির বিপরীতে তালিকাভুক্তির পর দ্রুত ইপিএস কমে যাওয়া, লোকসানে চলে যাওয়া, ...

শেয়ারবাজারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনের পরও প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য না পাওয়ায় এস্কয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড–এর আর্থিক সক্ষমতা ও আইপিও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইস্যু ম্যানেজার প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট–এর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হলেও আইপিও–পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির মুনাফা, লভ্যাংশ ও শেয়ারদরে ধারাবাহিক পতন দেখা গেছে। আইপিওর আগে টানা মুনাফা বৃদ্ধির বিপরীতে তালিকাভুক্তির পর দ্রুত ইপিএস কমে যাওয়া, লোকসানে চলে যাওয়া, ঋণ ও সুদব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি এবং শেয়ারদর ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে আসা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বলেন, শেয়ারবাজারে বিগত দুই কমিশনের সময়ে অসংখ্য ভুয়া কোম্পানিকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। যেসব কোম্পানি কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ উত্তোলন করেছে। এ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও অবহিত করা হয়েছিল। তবে অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়ত উল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন তাতে কর্ণপাত করেনি। তাই যা হওয়ার কথা ছিল, এখন তাই হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলোর লোকজন নামের ও বেনামের শেয়ার বিক্রি করে তারা কয়েকগুণ টাকা তুলে নিয়ে গেছে। এখন ওইসব কোম্পানি না থাকলেও তাদের কিছু যায় আসে না।

বুক বিল্ডিংয়ে অর্থ উত্তোলন :ইস্যু ম্যানেজার প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। ওইসময় প্রতিটি শেয়ারের কাট-অফ প্রাইস ৪৫ টাকা নির্ধারন হয়। এতে প্রতিটি শেয়ারে প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ৩৫ টাকা। তবে সাধারন বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪০ টাকা করে শেয়ার ইস্যু করে। কিন্তু সেই কোম্পানি সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় শুধুমাত্র সাধারন শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দেয়। যা কাট-অফ প্রাইস মূল্য বিবেচনায় ২.৫০ শতাংশ। অথচ যেকোন ব্যাংকে এফডিআর করলে কমপক্ষে ১০ শতাংশ নিশ্চিত পাওয়া যায়।

আইপিও ফান্ডের ব্যবহার :

এস্কয়ার নিটের ব্যবসা সম্প্রসারণে ২০১৯ সালে শেয়ারবাজার থেকে উত্তোলন করা ১৫০ কোটি টাকার মধ্যে ১০০.৪২ কোটি টাকা দিয়ে ভবন নির্মাণ, ৪৩.১৪ কোটি টাকা দিয়ে মেশিনারীজ ক্রয় ও ৬.৪৪ কোটি টাকা দিয়ে আইপিও ব্যয় পরিচালনা করার কথা জানিয়েছিল। তারপরেও শেয়ারবাজারে আসার পরে ব্যবসায় নিম্নমূখী এ কোম্পানিটির পারফরমেন্স।

আইপিওর আগে উত্থান :

এই কোম্পানিটির শেয়ারবাজারে আসার আগের ৫ অর্থবছরে টানা মুনাফা বেড়েছিল। দেখা গেছে, ২০১২ সালের ২.২৬ টাকার ইপিএস বা ১৭.৬২ কোটি টাকার নিট মুনাফা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছিল ইপিএস ৩.১২ টাকা বা মুনাফা ৩১.২১ কোটি টাকা। ওইসময় ৫ বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছিল ১৩.৫৯ কোটি টাকার বা ৭৭ শতাংশ।

আইপিওর পরে ইপিএস ও মুনাফায় পতন :

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরে ধারাবাহিক পতনে রয়েছে কোম্পানিটির মুনাফা। যা কমতে কমতে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে শেয়ারপ্রতি ০.৪৪ টাকা করে ৫.৯৭ কোটি টাকায়। মুনাফার এই নিম্নমূখী ধারা আরো বাজে অবস্থায় নেমেছে চলতি অর্থবছরে।

এ কোম্পানিটির চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই ২০২৫-মার্চ ২০২৬) শেয়ারপ্রতি (০.৯৬) টাকা করে (১২.৯৫) কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। তবে আগের অর্থবছরের ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি ০.৪৯ টাকা করে ৬.৬১ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছিল।

এ কোম্পানিটির তালিকাভুক্তির পর থেকে টানা মুনাফা কমছে। এরমধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে কমে শেয়ারপ্রতি ২.২০ টাকা করে নিট মুনাফা ২৯.৬৯ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২.৩৬ টাকা করে ৩১.৮৭ কোটি টাকায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ০.৬২ টাকা করে ৮.৪৩ কোটি টাকায় ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরেক ধাপ পতনের মাধ্যমে নেমে এসেছিল শেয়ারপ্রতি ০.৪১ টাকা করে ৫.৫৫ কোটি টাকায়।

লভ্যাংশে পতন :

এস্কয়ার নিট কম্পোজিট থেকে শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রাপ্তিতেও পতন হয়েছে। এ কোম্পানিটির পর্ষদ তালিকাভুক্তির পর ৩ অর্থবছর ১৫ শতাংশ করে নগদ লভ্যাংশ দিলেও সেটা গত ৪ অর্থবছর ধরে ১০ শতাংশে চলছে।

ব্যবসায় মন্দার মধ্যে শেয়ারবাজারে এসে ঋণ গ্রহন :

দেখা গেছে, প্রসপেক্টাস অনুযায়ি কোম্পানিটির শেয়ারবাজারে আসার আগে ২০১৭ সালের ৩০ জুন মোট ঋণ ও লিজ দায়ের পরিমাণ ছিল ১৫৮.৯১ কোটি টাকা। যা ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ দাঁড়িয়েছে ৬৯৭.৯৪ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৫৩৯.০৩ কোটি টাকা বা ৩৩৯ শতাংশ।

এই ঋণ বৃদ্ধিতে কোম্পানিটির আইপিও পূর্ব ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১১.৮৩ কোটি টাকার সুদজনিত ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ৬৯.৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদজনিত ব্যয় কমাতে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিটির আইপিও পরবর্তী সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে ১.৩৪ কোটি টাকা বা ৮৮ শতাংশ।

শেয়ার দর তলানিতে :

ব্যবসায় এই মন্দা ও কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ব্যবসায় উন্নতি নিয়ে কথায় ও কাজে মিল না থাকায়, শেয়ারটির দর নেমে এসেছে ইস্যু মূল্যের নীচে। শেয়ারটির দর কমতে কমতে ২৫.৫০ টাকায় নেমে এসেছে।

এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানিটির সচিব মনির হোসাইনের সঙ্গে এই প্রতিবেদক গত ১৪ মে, ২১ মে এবং ৭ জুন যোগাযোগ করেছে মন্তব্যের জন্য। প্রতিবারই তিনি মন্তব্য দেবেন বলে জানান। এরমধ্যে সবশেষ ৭ জুনের আলাপে তিনি এক-দুই দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো জানাননি।