বাংলাদেশের এক বছরের (২০২৬-২৭ অর্থবছর) জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো এক বছরেই করেছে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা মুনাফা। অর্থাৎ একক একটি কোম্পানির বার্ষিক মুনাফাই বাংলাদেশের পুরো জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি।

শুধু তাই নয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূলধন (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন) ৬ লাখ ৯৮ হাজার ২৯ কোটি টাকার বিপরীতে সৌদি আরামকোর এক বছরের ...

বাংলাদেশের এক বছরের (২০২৬-২৭ অর্থবছর) জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অথচ সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো এক বছরেই করেছে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা মুনাফা। অর্থাৎ একক একটি কোম্পানির বার্ষিক মুনাফাই বাংলাদেশের পুরো জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি।

শুধু তাই নয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূলধন (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন) ৬ লাখ ৯৮ হাজার ২৯ কোটি টাকার বিপরীতে সৌদি আরামকোর এক বছরের মুনাফা তারও প্রায় দ্বিগুণ।

সৌদি আরামকোর ২০২৫ সালের সমন্বিত (কনসোলিডেটেড) আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যে দেশের শেয়ারবাজার যত বড়, ওই দেশের অর্থনীতি তত বড়। উন্নত দেশগুলোতে শেয়ারবাজারের ভূমিকা অনেক। কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজার সে হিসেবে অনেক পিছিয়ে। যা সৌদি আরামকোর মুনাফার দিকে তাকাইলেই বোঝা যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার খুবই ছোট, এরমধ্যে লেনদেনের পরিমাণ আরও কম। এছাড়া আমাদের শেয়ারবাজার এখনও প্রাথমিক বা বিকাশের শুরু পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু অনেক সুযোগ থাকলেও বাজারটা বিকশিত হচ্ছে না। এর বড় কারণ সুশাসনের বড়ই অভাব। তাই বিশ্ব শেয়ারবাজার দিয়ে এগিয়ে গেলেও আমরা পারিনি।

সৌদি আরবের ধাহরানে প্রধান কার্যালয়ভিত্তিক সৌদি আরামকো হাইড্রোকার্বন সম্পদের অনুসন্ধান, উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিশোধন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে। ১৯৮৮ সালে রয়্যাল ডিক্রির মাধ্যমে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এর যাত্রা শুরু ১৯৩৩ সালে, যখন সৌদি সরকার এর পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানকে দেশটিতে হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের কনসেশন দেয়। পরে ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সৌদি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় কোম্পানিটি। আইপিওর অংশ হিসেবে সে সময় কোম্পানিটির একমাত্র মালিক সৌদি সরকার মোট ৩৪৫ কোটি সাধারণ শেয়ার, যা কোম্পানির মোট শেয়ার মূলধনের ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ বিক্রি করে।

আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালে সৌদি আরামকোর নিট মুনাফা ছিল ১৯ লাখ ৯৩ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেটিই ছিল কোম্পানিটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা। তবে পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়া, ওপেক প্লাসের উৎপাদন সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত, জ্বালানি পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবসায় মার্জিন সংকুচিত হওয়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার ধীরগতির প্রভাবে মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে ৮ লাখ ৩৭ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বা ৪২ শতাংশ।

২০২৫ সালে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ৪৮ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরামকোর মোট বিক্রয় আয় হয়েছে ৫১ লাখ ৪৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল বিক্রি থেকে এসেছে ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা। পরিশোধিত জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য থেকে আয় হয়েছে ২৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাস ও প্রাকৃতিক গ্যাসজাত তরল (এনজিএল) থেকে ২ লাখ ১৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, অস্থায়ী ও চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যজনিত সমন্বয় থেকে ১ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৩৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা আয় হয়েছে। বিক্রয়-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয় হয়েছে আরও ৩ লাখ ৬৯ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।

ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত ছিল পণ্য ও কাঁচামাল সংগ্রহ। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৫ লাখ ৫ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া উৎপাদন ও পরিশোধন কার্যক্রমসহ মোট পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৮২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এর বাইরে কোম্পানিটি সুদ, আয়কর ও যাকাত বাবদও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করেছে। শুধু জাকাতই পরিশোধ করেছে ৩ হাজার ৭২ কোটি টাকা।

আর্থিক প্রতিবেদনে সৌদি আরামকো জানিয়েছে, দেশটির কর আইন অনুযায়ী তেল ও হাইড্রোকার্বন খাতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সৌদি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে থাকা শেয়ারের ওপর করপোরেট আয়কর প্রযোজ্য নয়। ফলে এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিটিকে করের পরিবর্তে যাকাত পরিশোধ করতে হয়।

২০২৫ সালের শেষে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে সৌদি আরামকোর নিট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ২৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা।