অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক :    আর্থিক হিসাবে কারসাজি, সম্পদের ভুল মূল্যায়ন ও অনিয়মের কারণে দেশের আর্থিক খাতে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর মতে, বছরের পর বছর ধরে দুর্বল তদারকি ও বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশের কারণে আর্থিক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এসব অনিয়ম শনাক্ত করতে ফরেনসিক হিসাব ও নিরীক্ষার ওপর জোর ...

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : আর্থিক হিসাবে কারসাজি, সম্পদের ভুল মূল্যায়ন ও অনিয়মের কারণে দেশের আর্থিক খাতে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তাঁর মতে, বছরের পর বছর ধরে দুর্বল তদারকি ও বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশের কারণে আর্থিক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এসব অনিয়ম শনাক্ত করতে ফরেনসিক হিসাব ও নিরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ‘ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ফ্রড ইনভেস্টিগেশন’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অধ্যাপক তিতুমীর।

‘হিসাবের খাতায় যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তা ছিল না’

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের উদাহরণ তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ২০২৪ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ১১ শতাংশ দেখানো হলেও পরবর্তী ফরেনসিক নিরীক্ষায় প্রকৃত হার বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে উঠে আসে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানও চূড়ান্ত নয় বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ, এতদিন আর্থিক হিসাব ও প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, ফরেনসিক নিরীক্ষায় তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির বড় ধরনের পার্থক্য ধরা পড়েছে।

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘‘এতদিন ধরে যারা এগুলো দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন, তারা বলতে পারেন না এই টাকা কোথায় গেছে।’’

সম্পদের মূল্যায়নেও কারসাজির অভিযোগ

আর্থিক খাতের অনিয়মের পেছনে কোনো একক পক্ষ নয়, বরং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসাজশ কাজ করেছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক তিতুমীর।

তিনি বলেন, জমির মূল্যায়ন, সম্পদের মূল্যায়ন, নিরীক্ষা এবং আর্থিক হিসাব তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে এ ধরনের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা কাগজে এক রকম দেখালেও বাস্তবে তার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

অর্থ উপদেষ্টার মতে, এ ধরনের কারসাজি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ও বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ে।

বাজারকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দিতে হবে

দেশের বাজারব্যবস্থার দুর্বলতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, ‘‘আমাদের বাজার কোনো কাজ করে না। অর্থাৎ এখানে কেউ প্রাইস টেকার নয়, বরং মানুষ প্রাইস মেকার হিসেবে কাজ করছে এবং বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রকদের দ্বারা পরীক্ষিত হচ্ছে।’’

তাঁর মতে, বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা, নির্ভুল সম্পদ মূল্যায়ন এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা ছাড়া বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও সঠিক মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়।

নিয়ন্ত্রকদের জবাবদিহি জরুরি

নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘‘তদারককারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যারা সংবিধিবদ্ধ, তারা দুর্নীতিতে লিপ্ত হচ্ছেন। এজন্য দুদক এবং সুশীল সমাজকে এই দুর্নীতি নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রথমে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে মার্কেট যেন ফাংশন করে।’’

নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ছাড় বা শিথিলতার কারণে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ফরেনসিক হিসাবেই বের হবে কারসাজির চিত্র

আর্থিক জালিয়াতি শনাক্ত ও তদন্তে ফরেনসিক হিসাবের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাব, সম্পদের মূল্যায়ন বা আর্থিক লেনদেনে কারসাজি হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করতে ফরেনসিক নিরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে কোনো আর্থিক বিরোধ সালিশ বা মধ্যস্থতার পর্যায়ে গেলে সঠিক ও প্রমাণনির্ভর আর্থিক তথ্য প্রয়োজন হয়। কিন্তু চুক্তি, হিসাব বা সম্পদের মূল্যায়নের শুরুতেই যদি কারসাজি করা থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ব্যাংক খাত উদ্ধারে প্রয়োজন ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা

ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের কথাও তুলে ধরেন অর্থ উপদেষ্টা। তাঁর হিসাবে, ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং খাতটি পুনরুদ্ধারে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

অধ্যাপক তিতুমীরের বক্তব্যে উঠে আসে, আর্থিক খাতের প্রকৃত অবস্থা জানতে শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীর ওপর নির্ভর করলে হবে না। বরং হিসাবের তথ্য যাচাই, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ এবং লেনদেনের পেছনের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করতে হবে।

দেশে ফরেনসিক হিসাববিদের সংকট

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কমিশনার ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে ফরেনসিক হিসাববিদের সংখ্যা খুবই কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের রচিত বইটি দুদকের কাজে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

বইটি দুদকের প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও ফরেনসিক হিসাববিদের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রিয়াজুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। সঞ্চালনা করেন বইটির লেখক ও একই বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন।

‘ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং ও ফ্রড ইনভেস্টিগেশন’ বইটিতে আর্থিক জালিয়াতি, দুর্নীতি, অর্থপাচার, সাইবার প্রতারণা এবং আর্থিক বিবরণীতে কারসাজি শনাক্ত ও তদন্তের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বইটির লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দেওয়ান মাহবুব হোসেন, অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম, অধ্যাপক আল-আমিন এবং সহকারী অধ্যাপক রায়হান সোবহান। বইটি প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড।