এলডিসি উত্তরণে শুল্কঝুঁকি, ইইউর ২৭ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী
অভ্যন্তরীণ করব্যবস্থার জটিলতা, শুল্ক প্রক্রিয়ায় ধীরগতি ও প্রশাসনিক নানা বাধার কারণে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন পরিবেশনীতি, কারখানায় শ্রম ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার কঠোর শর্ত এবং এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বাণিজ্যিক জটিলতা নিরসন, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। রোববার অনুষ্ঠেয় ...
অভ্যন্তরীণ করব্যবস্থার জটিলতা, শুল্ক প্রক্রিয়ায় ধীরগতি ও প্রশাসনিক নানা বাধার কারণে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন পরিবেশনীতি, কারখানায় শ্রম ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার কঠোর শর্ত এবং এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বাণিজ্যিক জটিলতা নিরসন, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। রোববার অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নীতিগত ও প্রশাসনিক বাধা দূর করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ইইউর বাণিজ্যিক সম্পর্কের আকারও বেশ বড়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই পক্ষের মধ্যে বছরে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে রপ্তানি হয় প্রায় ২১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য। এর ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক—ওভেন ও নিটওয়্যার। বিপরীতে ইইউ থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২ দশমিক ১ থেকে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। এসব আমদানির মধ্যে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য উল্লেখযোগ্য।
তবে বড় বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিপরীতে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ এখনো সম্ভাবনার তুলনায় কম। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ প্রায় ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে ইউরোপীয় বিনিয়োগের একটি বড় অংশ পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফার ওপর নির্ভরশীল।
ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশটির ইইউমুখী রপ্তানি এখনো ব্যাপকভাবে তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে চামড়া, পাট, হিমায়িত খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বাজার সম্প্রসারণ প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না।
ইইউর কঠোর স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ড এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সনদের সীমাবদ্ধতাও অপ্রধান পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপের নতুন পরিবেশগত নীতি ও উৎপাদন পর্যায়ে শ্রম অধিকার এবং পরিবেশ সুরক্ষার কঠোর শর্ত। এসব মানদণ্ড পূরণ করতে গিয়ে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা এলডিসি উত্তরণের পর ইইউর বাজারে শুল্কসুবিধা। শুল্কমুক্ত ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) সুবিধা প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ৮ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে।
তবে একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও সবুজ শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। ইইউর ডিউ ডিলিজেন্স ও টেকসই উৎপাদনসংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে সবুজ কারখানা ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়াতে স্থানীয় করব্যবস্থা ও কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ইইউ ডেলিগেশনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আমদানিমূল্যের ওপর উচ্চহারে ন্যূনতম আয়কর, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়ের জটিলতা এবং অতিরিক্ত অগ্রিম ভ্যাটের মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এসব কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ছে বলে তাদের অভিযোগ।
পোস্ট-এলডিসি পরিস্থিতিতে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার বিষয়টি তৈরি পোশাকশিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, শুল্কসুবিধা ধরে রাখতে শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও গ্রিন ম্যানুফ্যাকচারিং নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের কাস্টমস ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার জটিলতা দূর করা জরুরি। দ্রুত নীতিগত সংস্কার করা গেলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে।
