লোকসান ও অস্তিত্ব সংকটে সোনারগাঁও টেক্সটাইল, তবু বাড়ছে শেয়ারদর
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলের ব্যবসায় চলছে দুরবস্থা। বছরের পর বছর লোকসান, কোম্পানির ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে নিরীক্ষকের শঙ্কা, ঋণ আদায়ে ব্যাংকের আইনগত পদক্ষেপ এবং আর্থিক হিসাবে দেখানো মজুদ পণ্য ও স্থায়ী সম্পদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে এই দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) নেই বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
শেয়ারদর ও লেনদেনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় গত ৩ আগস্ট সোনারগাঁও ...
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলের ব্যবসায় চলছে দুরবস্থা। বছরের পর বছর লোকসান, কোম্পানির ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে নিরীক্ষকের শঙ্কা, ঋণ আদায়ে ব্যাংকের আইনগত পদক্ষেপ এবং আর্থিক হিসাবে দেখানো মজুদ পণ্য ও স্থায়ী সম্পদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে এই দরবৃদ্ধির পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) নেই বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
শেয়ারদর ও লেনদেনের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় গত ৩ আগস্ট সোনারগাঁও টেক্সটাইলের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয় চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। জবাবে কোম্পানিটি জানায়, শেয়ারদর বা লেনদেনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কোনো অপ্রকাশিত তথ্য তাদের কাছে নেই।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর ৫৭ টাকা ২০ পয়সা বেড়ে ৯৪ টাকা ৯০ পয়সায় উঠেছে। অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসে দর বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি। অথচ কোম্পানিটি এখনও লোকসানে রয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৯ পয়সা। আগের অর্থবছরগুলোতেও কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ছয় বছরের চার বছরই লোকসান করেছে সোনারগাঁও টেক্সটাইল।
ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়েই শঙ্কা
কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা করে কোম্পানিটির ব্যবসা পরিচালনা ও ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন সোনারগাঁও টেক্সটাইলের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরেই কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এই আর্থিক পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির স্বাভাবিক ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।
শুধু লোকসান নয়, কোম্পানিটির ঋণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব ঋণের সুদ মওকুফের জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে।
৫৫ কোটি টাকার মজুদ নিয়েও প্রশ্ন
সোনারগাঁও টেক্সটাইলের আর্থিক হিসাবের বিভিন্ন তথ্য নিয়েও নিরীক্ষকের আপত্তি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে কোম্পানিটি ৫৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকার মজুদ পণ্য এবং ৬৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখিয়েছে। তবে সরেজমিনে এসব সম্পদ যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। বিকল্প কোনো পদ্ধতিতেও এসবের অস্তিত্ব যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া ওই অর্থবছরে ১৪ কোটি ৭ লাখ টাকার কাঁচামাল কেনার তথ্য আর্থিক হিসাবে দেখানো হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে নগদ টাকায় কেনা হয়েছে বলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে জানিয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণ না থাকায় এসব কাঁচামাল প্রকৃতপক্ষে কেনা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেননি নিরীক্ষক।
কোম্পানিটির অবণ্টিত লভ্যাংশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৪ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালের ১ লাখ টাকা অবণ্টিত লভ্যাংশ রয়েছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে এসব অর্থ অপ্রদানকৃত থাকলেও বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী তা ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে স্থানান্তর করা হয়নি। এমনকি পৃথক ব্যাংক হিসাবেও রাখা হয়নি।
এ ছাড়া কর্মীদের জন্য ১০ লাখ টাকার ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) থাকলেও তা বিতরণ করা হয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত কিছুর পরও দর বাড়ছে
অর্থাৎ কোম্পানিটির ব্যবসায়িক ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সাম্প্রতিক শেয়ারদরের উল্লম্ফনের মধ্যে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে কোম্পানির চলতি অর্থবছরের নয় মাসেও লোকসান, পুঞ্জীভূত লোকসান ১৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে নিরীক্ষকের শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ছয় মাসে শেয়ারদর বেড়েছে ৫৭ টাকা ২০ পয়সা।
এই দরবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে সিএসই চিঠি দিলেও কোম্পানির বক্তব্য, তাদের কাছে কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই। ফলে কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতির কোনো সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
১৯৯৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সোনারগাঁও টেক্সটাইলের পরিশোধিত মূলধন ২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর ৫৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে থাকা বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের হাতে।
