বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নীরবে কিন্তু গভীর একটি পরিবর্তন ঘটছে। ব্যাংকগুলো তাদের চিরাচরিত মূল ব্যবসা, অর্থাৎ ঋণ প্রদান ও সুদভিত্তিক আয় থেকে ক্রমেই সরে এসে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগনির্ভর আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেই নিট সুদ আয়ের তুলনায় বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় বহু গুণ বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের মৌলিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ...

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নীরবে কিন্তু গভীর একটি পরিবর্তন ঘটছে। ব্যাংকগুলো তাদের চিরাচরিত মূল ব্যবসা, অর্থাৎ ঋণ প্রদান ও সুদভিত্তিক আয় থেকে ক্রমেই সরে এসে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগনির্ভর আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালের আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেই নিট সুদ আয়ের তুলনায় বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় বহু গুণ বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের মৌলিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালের আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেয়ারবাজারের ৮৬ শতাংশ ব্যাংকেই এই প্রবণতা স্পষ্ট—যেখানে মূল ব্যবসার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, প্রাইজ বন্ড ও বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয়ই হয়ে উঠেছে প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও পূবালি ব্যাংকের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আয়ের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো।

এই পরিবর্তনকে ব্যাংক খাতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন্স সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের মতে, স্বল্প ঝুঁকির বিনিয়োগে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে আয় বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ও কর্মসংস্থানের কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালে নিট সুদজনিত আয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৫০৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। একইসময়ে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৩৮ হাজার ৩২৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল ব্যবসার তুলনায় বিনিয়োগ থেকে ৩৫ হাজার ৮১৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বা ১৪২৯ শতাংশ বেশি আয় হয়েছে। এই আয় করতে ব্যাংকগুলো ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।

এ বিষয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুরর আরেফিন বলেন, ঋণের বাজার ধীরগতি চলছে। বিপরীতে সরকারের ব্যাংক খাতের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। এ কারনে ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ড-বিলে বিনিয়োগে ঝুঁকেছে। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য ভালো না।

তথ্যমতে, শেয়ারবাজারের ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ২৬টি বা ৮৭ শতাংশ ব্যাংকেরই মূল ব্যবসার থেকে বিনিয়োগ থেকে আয় বেশি হয়েছে। বাকি ইসলামী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মূল ব্যবসায় বেশি আয় হয়েছে। এই ৪ ব্যাংকের মূল ব্যবসায় ৪ হাজার ৮৯৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকার বিপরীতে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে ১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এই ব্যাংকগুলো থেকে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ৮৪৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

এদিকে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংক এশিয়া, রূপালি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এবি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও এনআরবি ব্যাংক মূল ব্যবসায় আরেক ধাপ পিছিয়ে। এই ব্যাংকগুলোর নিট সুদজনিত আয় ঋণাত্মক হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ঋণ দিয়ে যে পরিমাণ সুদ আয় করেছে, গ্রাহকদের আমানতের পেছনে তার চেয়ে বেশি একই ব্যয় হয়েছে।

এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর মূল ব্যবসা ঋণ দিয়ে সুদজনিত আয়। তবে ৩-৪ বছর ধরে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণের পরিবর্তে সিকিউরিটিজ, ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল, প্রাইজ মানিতে বিনিয়োগে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে। এতে অনেক ব্যাংকের মূল ব্যবসার থেকে বিনিয়োগ থেকে আয় হচ্ছে বেশি। ব্যাংক খাতের এই পরিবর্তন খুবই অশনিসংকেত।

তিনি বলেন, একটি ব্যাংকে গ্রাহকদের কারেন্ট হিসাবে থাকা টাকার বিপরীতে কোন সুদ দেওয়া হয় না, সেভিংস হিসাবে খুবই সামান্য দেওয়া হয় এবং এফডিআর এর ক্ষেত্রে বেশি দেওয়া হয়। তাই ব্যাংকের নিট সুদ আয় বেশি হওয়া স্বাভাবিক এবং এটাই এতোবছর হয়ে আসতেছিল।

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ থেকে আয় করতে ৫-৬ জনের একটি দল থাকলেই হয়। কিন্তু সব ব্যাংকেই শত শত লোকবল রয়েছে। বিনিয়োগ থেকে আয়কেই প্রধান লক্ষ্য ধরা হলে বিদ্যমান এতো লোকবলের দরকার পড়বে না।

জানা গেছে, সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ ব্যাংকটির ২০২৫ সালে বিনিয়োগ থেকে আয় করেছে ৩ হাজার ৭৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই আয় করতে ব্যাংকটি থেকে সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৬২৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। অথচ ব্যাংকটির মূল ব্যবসায় বা নিট সুদজনিত আয় হয়েছে ১ হাজার ১৭৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

এই ব্র্যাক ব্যাংকেরই ৫ বছর আগে ২০২০ সালে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছিল ৬৪৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং নিট সুদজনিত আয় হয়েছিল ১ হাজার ১২০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ওই বছর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮৮৯ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। এ হিসাবে ৫ বছরের ব্যবধানে ব্র্যাক ব্যাংকের নিট সুদজনিত আয় ৫৭.১১ কোটি টাকা বা ৫ শতাংশ বাড়লেও বিনিয়োগ থেকে বেড়েছে ৩১৪৭.৮৪ কোটি টাকা বা ৪৮৮ শতাংশ।

২০২৫ সালে বিনিয়োগ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আয় করেছে সিটি ব্যাংক। আর ৩ হাজার ৫০৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে পূবালি ব্যাংক। এই আয় করতে সিটি ব্যাংক থেকে ২০ হাজার ১২১ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং পূবালি ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার ৪৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

এই দুই ব্যাংকের মধ্যে সিটি ব্যাংকের ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নিট সুদ আয় ৫৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বা ৬৬ শতাংশ কমে এসেছে। তবে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৩ হাজার ২১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বা ৯৩৬ শতাংশ এবং বিনিয়োগ বেড়েছে ১৫ হাজার ৪৯৫ কোটি ৯২ লাখ টাকার বা ৩৩৫ শতাংশ। আর পূবালি ব্যাংকের সুদ আয় ৬৬৩ কোটি ৭ লাখ টাকার বা ২৩১ শতাংশ বাড়লেও বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ২ হাজার ২৩৩ কোটি ১১ লাখ টাকা বা ১৭৬ শতাংশ। ব্যাংকটির বিনিয়োগ বেড়েছে ১৫ হাজার ২৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বা ১০৩ শতাংশ।

নিম্নে ব্যাংক গুলোর ২০২৫ সালের নিট সুদ আয়, বিনিয়োগ আয় ও বিনিয়োগের তথ্য তুলে ধরা হল-

ব্যাংকের নাম

নিট সুদ আয়

(কোটি টাকায়)

বিনিয়োগ আয়

(কোটি টাকায়)

বিনিয়োগ

(কোটি টাকায়)

ব্র্যাক ব্যাংক

১১৭৭.৭৯

৩৭৯৩.৫০

৩২৬২৫.৬৪

সিটি ব্যাংক

২৮৪.৭৩

৩৫৬১.৮৬

২০১২১.০৬

পূবালি ব্যাংক

৯৪৯.৫৭

৩৫০৩.৮৫

৩০০৪৩.৩৪

ব্যাংক এশিয়া

(১২৭.৬৭)

২৬৩৮.৫০

২১৯৮১.৯৫

রূপালি ব্যাংক

(১৫৭৫.৪৩)

২২৯২.০৭

২২৫১৪.৫৯

ডাচ-বাংলা ব্যাংক

১৯৫৪.৫৯

২২০২.১৬

২৫৩৮৩.৫৩

প্রাইম ব্যাংক

৩৭৬.৫৫

১৭২৯.৪৯

১৯৫৩৮.৪৩

এনবিএল

(৩৫৬৬.৬৩)

১৫২৬.১১

১২৮৮.২১

ইউসিবি

৯৮৬.২৬

১৪৯৩.৪৩

১৪৮৭১.৪৫

ট্রাস্ট ব্যাংক

৪২৬.২৫

১৪৭৬.৯৭

১৫৫৯৭.২৬

ইস্টার্ন ব্যাংক

৯৮৩.৩০

১৪৫৩.০৫

২১১৪৭.৩১

এমটিবি

২৬৫.৩৮

১৪৩৭.৪৩

১২৫০৭.৯৮

যমুনা ব্যাংক

৩২.৯৭

১২৮০.৬৬

২০১৯৮.৬১

সাউথইস্ট ব্যাংক

২০৮.৮৯

১১৩৩.০৪

১২১০৬.৬৮

এনসিসি ব্যাংক

৫৬২.৬৪

১০০২.১৫

৯৮৩৯.৯৭

মার্কেন্টাইল ব্যাংক

১৯.৮৬

৯৩৪.৮৪

১২৭৮৫.৩৬

ঢাকা ব্যাংক

৫৯১.২৪

৮৯২.৮৯

১১৬৯৬.৯২

আইএফআইসি

(২২০৯.৪৭)

৭২৫.১৪

৬৬৮৪.৩২

এনআরবিসি

১৭০.৮০

৬৮৯.২৩

৬৯৭০.৮৬

ওয়ান ব্যাংক

২৪৮.৭৬

৬৬৯.৭৯

৫৬৬২.৮৫

ইসলামীব্যাংক

১৮৩২.৯৯

৬৮১.৬১

১৯৬৩৭.৬৬

উত্তরাব্যাংক

১১৫৪.৭৪

৬০১.৭১

৭৩৮৯.০২

মিডল্যান্ড ব্যাংক

(৯০.৫৪)

৪৬৬.৩১

৩৭৭০.৩৪

এবিব্যাংক

(৩৫৪২.৫৫)

৩৯৬.৮৮

২০০৯.৬৩

আল-আরাফাহ

৬০৬.৭৫

৩৮৭.৫৮

৭১১৩.০৮

প্রিমিয়ার ব্যাংক

(৬০০.৫৮)

৩৪১.১৪

১৫৫০.৩৮

শাহজালালব্যাংক

১৩০৪.৩৬

২৮৪.১৫

৪৭০৬.০১

এনআরবি ব্যাংক

(৯.৮৮)

২৫৮.৭৯

২৩৫২.৪৫

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

১.৩৬

২৫৪.০৫

৪০৬৫.০২

এসবিএসি ব্যাংক

৮৯.৫২

২১৫.০১

২৩৬৪.৪৯

মোট

২৫০৬.৫৫

কোটি টাকা

৩৮৩২৩.৩৯ কোটি টাকা

৩৭৮৫২৪.৪ কোটি টাকা