আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসির ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনায় একাধিক ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, একদিকে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত বেড়েছে, অন্যদিকে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও দায়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ–দায় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বেড়েছে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আইপিডিসির শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ছিল ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে ...

আইপিডিসি ফাইন্যান্স পিএলসির ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনায় একাধিক ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, একদিকে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত বেড়েছে, অন্যদিকে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও দায়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ–দায় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

বেড়েছে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আইপিডিসির শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ছিল ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশে।

প্রতিবেদনে হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে প্রতিষ্ঠানটির শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের ৫.৯৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫.৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ০.১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। এর আগে ২০২১ সালে ৩.১৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ৪.১৪ শতাংশ ও ২০২৩ সালে ৪.৯৩ শতাংশ ছিল এই ঋণ। অর্থাৎ নিয়মিত অবলোপন বাড়ছে।

যদিও বৃদ্ধির হার খুব বেশি নয়, তবু ঋণের মান অবনতির ধারাবাহিকতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ, শ্রেণিকৃত ঋণ বাড়লে আদায়-ঝুঁকি, সংরক্ষণ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

অবলোপন করা ঋণ বেড়েছে ১২০ শতাংশের বেশি

শ্রেণিকৃত ঋণের পাশাপাশি অবলোপন করা ঋণের পরিমাণেও বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে অবলোপন করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে অবলোপন করা ঋণ বেড়েছে ১২০ দশমিক ৩ শতাংশ।

২০২৫ সালে নতুন করে ১০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। বিপরীতে, অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, আগের বছরের ৮৭০ মিলিয়ন টাকার সঙ্গে ২০২৫ সালে ১ হাজার ৫৭ মিলিয়ন টাকা যোগ এবং ১০ মিলিয়ন টাকা আদায় বাদ দেওয়ার পর বছর শেষে অবলোপন করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯১৭ মিলিয়ন টাকা।

তবে উল্লেখ্য, ঋণ অবলোপন করা মানেই ঋণগ্রহীতার দায় সম্পূর্ণ মওকুফ হয়ে যাওয়া নয়। সাধারণত হিসাবের খাতা থেকে ঋণ বাদ দেওয়া হলেও আদায়ের কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে। তবু অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়া ঋণমান ও আদায় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

ঋণ পোর্টফোলিওতে ‘অন্যান্য’ খাতের বড় অংশ

আইপিডিসির ঋণপোর্টফোলিও বিশ্লেষণ করেও ঝুঁকির কিছু দিক দেখা যায়। প্রতিবেদনের ঋণ বিতরণ তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭৪ হাজার ৬২২ মিলিয়ন টাকার ঋণের মধ্যে ‘অন্যান্য’ খাতে রয়েছে ৩৩ হাজার ২০ মিলিয়ন টাকা। মোট ঋণের হিসাবে এই খাতের অংশ ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ ছাড়া তৈরি পোশাক ও নিট পোশাক খাতে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ২৩ মিলিয়ন টাকা, যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। সামাজিক খাতে রয়েছে ৩ হাজার ৯৩৩ মিলিয়ন টাকা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। পরিবহন ও উড়োজাহাজ খাতে ঋণ রয়েছে ২ হাজার ৬৪৪ মিলিয়ন টাকা বা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও রাবার খাতে ঋণের পরিমাণ ২৯০ মিলিয়ন টাকা বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। বস্ত্র খাতে ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৩৯০ মিলিয়ন টাকা বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ।

ঋণ পোর্টফোলিওর বড় অংশ ‘অন্যান্য’ খাতে থাকায় এই খাতের উপখাতভিত্তিক ঋণ বিতরণ, ঋণমান ও আদায় পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। কারণ, খাতভিত্তিক ঝুঁকি স্পষ্টভাবে জানা না গেলে সামগ্রিক ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আমানতে প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরতা বেশি

২০২৫ সালের শেষে আইপিডিসির মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ২৪৯ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৬ হাজার ২২৫ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাদে গ্রাহক আমানতের পরিমাণ ৬০ হাজার ৯১৮ মিলিয়ন টাকা, যা মোট আমানতের ৯৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। গ্রাহক আমানতের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির আমানত রয়েছে ২৩ হাজার ২৩৯ মিলিয়ন টাকা। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৬৭৯ মিলিয়ন টাকা।

হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহক আমানতের মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির অংশ প্রায় ৩৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের অংশ ৬১ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

অর্থাৎ, আইপিডিসির গ্রাহক আমানতের বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক উৎসনির্ভর। প্রাতিষ্ঠানিক আমানত সাধারণত তুলনামূলকভাবে বড় অঙ্কের হলেও এসব আমানত দ্রুত প্রত্যাহার বা নবায়ন না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে আমানতের উৎসে বৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও দায়ের ব্যবধান ১,৪১৪ কোটি টাকা

আইপিডিসির সম্পদ ও দায়ের মেয়াদভিত্তিক বিশ্লেষণেও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান দেখা যায়। বার্ষিক প্রতিবেদনের ‘সম্পদ ও দায়ের মেয়াদ বিশ্লেষণ’ সারণি অনুযায়ী, পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি সম্পদের পরিমাণ ১৮ হাজার ৯১৫ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি দায়ের পরিমাণ ৩৩ হাজার ৫৬ মিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৩ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা।

ফলে এই মেয়াদে সম্পদের তুলনায় দায় বেশি রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ১৪০ মিলিয়ন টাকা বা ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদি সম্পদ ও দায়ের মধ্যে বড় ধরনের ঋণাত্মক ব্যবধান রয়েছে।

এ ধরনের ব্যবধানকে সরাসরি সামগ্রিক তারল্যসংকট বলা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ–দায় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি দায়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ না থাকলে ভবিষ্যতে তহবিল ব্যবস্থাপনা ও পুনঃঅর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

সুদ ব্যয় বেড়েছে, নিট সুদ আয় কমেছে

প্রতিবেদনের আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির সুদ আয় বেড়েছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে একই সময়ে সুদ ব্যয় বেড়েছে ১৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর ফলে নিট সুদ আয় কমেছে ১৬ দশমিক ১৭ শতাংশ।

অর্থাৎ, সুদ আয় বাড়লেও সুদ ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় মূল আয়ধারায় চাপ তৈরি হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিট সুদ আয় গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হওয়ায় এই পতন পরিচালন সক্ষমতা ও মুনাফার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ঋণ, ইজারা ও বিনিয়োগের বিপরীতে মোট সংরক্ষণ ব্যয় হয়েছে ৯৩৪ মিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃত মুনাফা প্রবৃদ্ধি দুর্বল

মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করে গত ১০ বছরের আর্থিক কর্মদক্ষতা বিশ্লেষণেও মুনাফা প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দুর্বলতার চিত্র পাওয়া যায়। বার্ষিক প্রতিবেদনের ৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে আইপিডিসির রাজস্বের বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ।

একই সময়ে পরিচালন মুনাফার বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ২০ শতাংশ হলেও নিট মুনাফার প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৮১ শতাংশ।

অর্থাৎ, রাজস্ব ও পরিচালন মুনাফা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বাড়লেও মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর নিট মুনাফার দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অনেক কম। এতে ব্যয়, সুদ ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের প্রভাব স্পষ্ট হয়।

অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন ঋণাত্মক

প্রতিবেদনে দেওয়া অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের হিসাবেও সতর্কতার ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৫ সালে আইপিডিসির অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন ঋণাত্মক ১ মিলিয়ন টাকা দেখানো হয়েছে।

অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন সাধারণত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা থেকে মূলধনের ব্যয় বাদ দেওয়ার পর প্রকৃত মূল্য সৃষ্টির চিত্র তুলে ধরে। এই সূচক ঋণাত্মক হওয়া মানে হলো, হিসাবভিত্তিক মুনাফা থাকলেও মূলধনের ব্যয় বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারেনি।

সব মিলিয়ে আইপিডিসির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে একাধিক ইতিবাচক আর্থিক ফলাফল থাকলেও ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনায় কিছু ঝুঁকির দিকও স্পষ্ট হয়েছে। শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত বৃদ্ধি, অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ১২০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়া, ঋণপোর্টফোলিওতে ‘অন্যান্য’ খাতের বড় অংশ, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার ব্যবধান—সবগুলো বিষয়ই ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।