সিগারেট বিক্রি ৫০৭৪ কোটি পিস
বিএটিবিসির মাধ্যমে সরকারের আয় ৪০ হাজার কোটি টাকা
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক তামাক কোম্পানি বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি অব বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) দেশের রাজস্ব আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রির বিপরীতে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর পেয়ে থাকে, যার পরিমাণ ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে এ কোম্পানিটির ঢাকার কারখানা বন্ধ করতে হওয়ায় বছরটিতে মুনাফায় বড় ধাক্কা খেয়েছে।
দেখা গেছে, বিএটিবিসির ২০২৫ সালে গ্রোস ৪৬ হাজার ২৮৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সিগারেট ...
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক তামাক কোম্পানি বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি অব বাংলাদেশ (বিএটিবিসি) দেশের রাজস্ব আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। কোম্পানিটির সিগারেট বিক্রির বিপরীতে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর পেয়ে থাকে, যার পরিমাণ ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে এ কোম্পানিটির ঢাকার কারখানা বন্ধ করতে হওয়ায় বছরটিতে মুনাফায় বড় ধাক্কা খেয়েছে।
দেখা গেছে, বিএটিবিসির ২০২৫ সালে গ্রোস ৪৬ হাজার ২৮৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সিগারেট বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে সরকারকে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাটবাবদ দিয়েছে ৩৭ হাজার ৯৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এছাড়া সরকারকে দেওয়ার জন্য ওই বছরে ৯৪৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার আয়কর সঞ্চিতি গঠন করেছে।
কোম্পানিটির এর আগের বছর ৪৩ হাজার ২৩১ কোটি ৮৫ লাখ টাকার সিগারেট বিক্রি হয়েছিল। এরমধ্যে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট ছিল ৩৭ হাজার ৯৪১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে কোম্পানিটির বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সিগারেট বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ৩ হাজার ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকার বা ৭ শতাংশ।
এ কোম্পানিটির ২০২৫ সালে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাদে নিট সিগারেট বিক্রির পরিমাণ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার। যার পরিমাণ আগের বছরে ছিল ৯ হাজার ৯৪৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে কোম্পানিটির ২০২৫ সালে সিগারেট বিক্রির পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪২ লাখ টাকা বা ১৬ শতাংশ।
বিএটিবিসির ২০২৫ সাল ৪৬ হাজার ২৮৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয় করতে ৫ হাজার ৭৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার পিস সিগারেট বিক্রি করতে হয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ৯০ লাখ ২০ হাজার কেজি তামাক পাতা বিক্রি করতে হয়েছে। তারপরেও কোম্পানিটির ক্ষতি ও ব্যয় বৃদ্ধিতে মুনাফায় বড় পতন হয়েছে।
এ কোম্পানিটির আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে পরিচালন ব্যয় ও সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া কারখানা পূণ:গঠনে বড় ধরনের ব্যয় হয়েছে। যাতে নিট আয় ১৬ শতাংশ কমলেও মুনাফা কমেছে ৬৭ শতাংশ।
কোম্পানিটির ২০২৪ সালে নিট মুনাফা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫০ কোটি ৮৫ লাখ টাকার বা শেয়ারপ্রতি ৩২.৪২ টাকা। যা কমে ২০২৫ সালে হয়েছে ৫৮৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি ১০.৮১ টাকা। এ হিসেবে কোম্পানিটির বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে ১ হাজার ১৬৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বা ৬৭ শতাংশ।
মুনাফায় এই পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে রয়েছে কোম্পানিটির কারখানা পুনর্গঠন ও স্থানান্তর ব্যয়। এ কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ গত বছরের ১৯ জুন ঢাকার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি কোম্পানিটির রেজিস্টার অফিস পরিবর্তনেরও সিদ্ধান্ত নেয়।
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে লিজ চুক্তি নবায়নের আপিল সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হওয়ার পর রাজধানীর মহাখালী ডিওএইচএস এলাকায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয় ও কারখানার জায়গা খালি করে দেয় বিএটিবিসি। গত বছরের ১ জুলাই থেকে আশুলিয়া থানার ধামসোনা ইউনিয়নের বলিভদ্র বাজার এলাকায় নতুন ঠিকানায় কার্যক্রম শুরু করে কোম্পানিটি।
বিএটিবিসির ঢাকার কারখানা বন্ধের কারণে তাদের সাভার কারখানায় ২৯৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। সাভার কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এ সিদ্ধান্ত নেয় বিএটিবিসির পর্ষদ।
ঢাকার কারখানা বন্ধ ও সাভারে কারখানা পুনর্গঠন করতে গিয়ে বিএটিবিসির ৭১৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে স্থায়ী সম্পদের ক্ষতি। ঢাকার কারখানা বন্ধ করায় ওই কারখানার স্থায়ী সম্পদের ক্ষতি হয় ৩৭৫ কোটি ৭ লাখ টাকা।
২০২৫ সালে পুনর্গঠন ও স্থানান্তর ছাড়াও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে অনেকাংশে। কোম্পানিটির আগের বছরের ৭৯৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার পরিচালন ব্যয় ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ২৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার বা ৩২ শতাংশ।
এছাড়া কোম্পানিটির আগের বছরের ৭৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার সুদজনিত ব্যয় ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৭১ কোটি ১ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে ৯৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকার বা ১২৪ শতাংশ।
এসব ব্যয় বৃদ্ধিতে কোম্পানিটির মুনাফা ২০২৫ সালে তলানিতে নেমে এসেছে। যে কারনে কোম্পানিটির পর্ষদ লভ্যাংশ কমিয়ে এনেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। ওই বছরের জন্য ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষনা করেছে। যা এর আগে ১৫ বছরের (২০১০-২০২৫) মধ্যে এতো কম লভ্যাংশ ঘোষণা করার রেকর্ড নাই।
মুনাফা নিয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ডিএসইকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ৬৭ শতাংশ কমেছে। এ পতনের পেছনে প্রধানত নিম্ন টার্নওভার এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি দায়ী, যা মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ ও ব্যবসার কিছু খাতে কার্যক্রম বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে।
৫৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিএটিবিসির ৫ হাজার ৫৩৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার নিট সম্পদ রয়েছে। যা প্রতিটি শেয়ার হিসেবে নিট সম্পদের (এনএভিপিএস) পরিমাণ ১০২.৫০ টাকায়। এই বৃহৎ সম্পদের কোম্পানিটিতে ৯৭০ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব সৈয়দ আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি। এছাড়া কমিউনিকেশন বিভাগে যোগাযোগ করে কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, বেনসন, গোল্ড লীফ, ক্যাপস্টান, লাকি স্ট্রাইক, স্টার, রয়েলস, ডারবি, পাইলট এবং হলিউড তামাকজাত পণ্যের উৎপাদনকারী এ প্রতিষ্ঠানটি তামাকজাত পণ্য বিক্রির দিকে থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বজুড়ে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করা কোম্পানিটি বাংলাদেশেও দীর্ঘদিন ধরে দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে।
১৯৭৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বিএটিবিসির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৪০ কোটি টাকা। এরমধ্যে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণির (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ২৭.০৯ শতাংশ। কোম্পানিটির বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ২২৯.৯০ টাকায়।
