ঋণ করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ
শেয়ারবাজারের সূচক বাড়া বা কমাকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বসিত কিংবা উদ্বিগ্ন না হয়ে বাজার সংস্কার, বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পেশাদার আর্থিক পরামর্শ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার নাফিজ আল তারিক।
তিনি বলেছেন, “উই ক্যান নট কন্ট্রোল হোয়্যার দ্য ইনডেক্স মুভস। ইনডেক্স যদি বাড়ে, আমাদের সেলিব্রেট করার দরকার নেই। ইনডেক্স যদি কমে, আমাদের ওয়ারিড হওয়ার দরকার নেই।”
বুধবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে ...
শেয়ারবাজারের সূচক বাড়া বা কমাকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বসিত কিংবা উদ্বিগ্ন না হয়ে বাজার সংস্কার, বিনিয়োগকারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পেশাদার আর্থিক পরামর্শ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার নাফিজ আল তারিক।
তিনি বলেছেন, “উই ক্যান নট কন্ট্রোল হোয়্যার দ্য ইনডেক্স মুভস। ইনডেক্স যদি বাড়ে, আমাদের সেলিব্রেট করার দরকার নেই। ইনডেক্স যদি কমে, আমাদের ওয়ারিড হওয়ার দরকার নেই।”
বুধবার ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) ও সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সূচকের চেয়ে বাজার সংস্কারে নজরবিএসইসি কমিশনার বলেন, শেয়ারবাজারের সূচক কোন দিকে যাবে, তা কমিশনের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে বাজারের কাঠামোগত সংস্কার, আইনগত উন্নয়ন এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমে বাজারকে শক্তিশালী করা যায়।
তিনি বলেন, “আমরা যে সংস্কারগুলো করার চেষ্টা করছি, যে আইনগুলো নিয়ে কাজ করছি এবং যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কাজ করতে পারি। সূচক কোথায় যাচ্ছে, সেটার দিকে ফোকাস না করে আমাদের অন্য কিছু কেপিআইয়ের দিকে তাকানো উচিত।”
বিনিয়োগকারীর ‘রেজিলিয়েন্স’ কেন গুরুত্বপূর্ণবিনিয়োগকারীর রেজিলিয়েন্স বা প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতি সামলে থাকার সক্ষমতা প্রসঙ্গে নাফিজ আল তারিক বলেন, এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—আর্থিক রেজিলিয়েন্স ও আচরণগত রেজিলিয়েন্স।
তার মতে, বাজারে বড় ধরনের পতন হলে বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল থাকলে তাকে অনেক সময় লোকসানে বিনিয়োগ বিক্রি করতে হয়। বিশেষ করে যে অর্থ স্বল্পমেয়াদে প্রয়োজন, তা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, “বিনিয়োগ করার আগে আমাকে চিন্তা করতে হবে, এই টাকাটা আসলে স্টক মার্কেটে যাওয়ার যোগ্য কি না।”
ঋণ করে বিনিয়োগে বড় ঝুঁকিঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিপদ তুলে ধরে তিনি বলেন, বাজারে বড় ধরনের পতন হলে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারী চাইলেও অনেক সময় শেয়ার ধরে রাখতে পারেন না।
বিশেষ করে মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে বাজার পতনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বিক্রি করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
“যখন আমরা মার্জিন লোন নিই, এরকম মার্কেট যখন ডাউনটার্ন হয়, তখন আমি না চাইলেও আমাকে স্টক বিক্রি করতে হচ্ছে,” বলেন তিনি।
সরাসরি শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণনতুন ও অনেক খুচরা বিনিয়োগকারীর জন্য সরাসরি শেয়ারে বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন বিএসইসি কমিশনার।
তিনি বলেন, একজন বিনিয়োগকারী এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হঠাৎ দেখলেন তার পোর্টফোলিওর মূল্য ৬০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। ৪০ লাখ টাকার লোকসান দেখে স্বাভাবিক থাকা অনেকের পক্ষেই কঠিন।
এ কারণে বিনিয়োগকারীর আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি মানসিক ও আচরণগত সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
মিউচুয়াল ফান্ডে ঝুঁকি কমানোর সুযোগসরাসরি শেয়ারে বিনিয়োগের পরিবর্তে ভালো মানের বৈচিত্র্যময় মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন নাফিজ আল তারিক।
তিনি বলেন, বাজার ২০-৩০ শতাংশ কমে গেলেও দক্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপকের পরিচালিত বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
“আমি নিজে ইনভেস্টমেন্ট করে ৫০ শতাংশ লস করেছি, কিন্তু ডাইভার্সিফাইড মিউচুয়াল ফান্ডে ইনভেস্টমেন্ট করে হয়তো ১০ শতাংশ লস করতাম,” বলেন তিনি।
তবে সব মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা সব সম্পদ ব্যবস্থাপক ভালো নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফান্ড ও সম্পদ ব্যবস্থাপকের মান এবং পারফরম্যান্সে পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিনিয়োগের আগে সঠিক তথ্য ও পরামর্শ পাওয়া জরুরি।
FOMO-তে ভুল বিনিয়োগের ঝুঁকিবাজার যখন বাড়তে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা FOMO কাজ করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বন্ধু বা পরিচিতজনের লাভ দেখে অনেক বিনিয়োগকারী এমন শেয়ারে বিনিয়োগ করে ফেলেন, যেখানে তার বিনিয়োগ করা উচিত নয়। আবার বাজার পড়লে ভয় ও মানসিক চাপের কারণে অনেকেই ভুল সময়ে শেয়ার বিক্রি করে দেন।
নাফিজ আল তারিক বলেন, “আমাদের অনেক ধরনের সাইকোলজিক্যাল বায়াস আছে। এই সাইকোলজিক্যাল বায়াসগুলো আমাদেরকে কন্টিনিউয়াসলি অ্যাফেক্ট করে।”
শিগগিরই আসছে নিবন্ধিত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজরবিনিয়োগকারীদের পেশাদার আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর ব্যবস্থা চালুর কাজ এগিয়ে চলছে বলে জানিয়েছেন বিএসইসি কমিশনার।
তিনি বলেন, “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর লাইসেন্স নিয়ে অলরেডি কাজ হচ্ছে। কাজ হাফ ডান, ইট ইজ ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস।”
আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নিবন্ধিত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজর সংক্রান্ত বিধি দেখা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধির কাছে গিয়ে কোন শেয়ারের দাম বাড়বে বা কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করলে দ্রুত টাকা দ্বিগুণ হবে—এ ধরনের পরামর্শের পরিবর্তে নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শকের কাছ থেকে পেশাদার পরামর্শ নিতে পারবেন।
ব্রোকারের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শে জবাবদিহি নেইঅনেক ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নিজেদের ফান্ড ম্যানেজার হিসেবে উপস্থাপন করে বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিলেও তারা নিয়ম অনুযায়ী বিনিয়োগ পরামর্শ দেওয়ার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত নন বলে মন্তব্য করেন নাফিজ আল তারিক।
তার মতে, অনানুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগ পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থাকে না। অথচ একজন মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজারের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।
“জবাবদিহিতা ছাড়া একটা দায়িত্ব নিলে সেই দায়িত্বটা ভালোভাবে পালিত হবে না,” বলেন তিনি।
বিনিয়োগকারীর জন্য ‘ডাক্তারের মতো’ পরামর্শ ব্যবস্থাবিনিয়োগকারীদের জন্য নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শককে চিকিৎসকের সঙ্গে তুলনা করেছেন বিএসইসি কমিশনার।
তিনি বলেন, একজন মানুষ অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসকের কাছে যান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন, বিনিয়োগকারীদেরও তেমন একটি পেশাদার পরামর্শের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কোন মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা উচিত, কোন সম্পদ ব্যবস্থাপকের ট্র্যাক রেকর্ড ভালো এবং বিনিয়োগের আগে কোন বিষয়গুলো যাচাই করা দরকার—এসব সিদ্ধান্তেও পেশাদার পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘পিচ কিউরেটরের’ মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকানিজের বর্তমান দায়িত্বকে ক্রিকেটের পিচ কিউরেটরের সঙ্গে তুলনা করে নাফিজ আল তারিক বলেন, কিউরেটরের কাজ কোনো একটি দলকে সুবিধা দেওয়ার মতো করে পিচ তৈরি করা নয়। বরং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পিচ তৈরি করা, যেখানে ফাস্ট বোলার, স্পিনার ও ব্যাটসম্যান—সবার জন্যই সুযোগ থাকে।
একইভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজও কোনো নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং সব অংশীজনের জন্য ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজার তৈরি করা।
তিনি বলেন, “আমাদেরকে পিচটা এমনভাবে বানাতে হবে—দেয়ার ইজ সামথিং ফর দ্য ফাস্ট বোলার, সামথিং ফর দ্য স্পিনার, সামথিং ফর দ্য ব্যাটসম্যান অ্যাজ ওয়েল।”
বিনিয়োগকারীর সামনে একাধিক বিকল্প চানবিএসইসি কমিশনার বলেন, বিনিয়োগকারীর রেজিলিয়েন্স বাড়াতে শুধু আর্থিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। তাদের সামনে পেশাদার ও বৈচিত্র্যময় বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করতে হবে।
