অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক :   টানা দরপতনে বিপর্যস্ত শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকারের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে বাজারের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা। এ জন্য প্রথমে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) পুনর্গঠন করে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছেন ...

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : টানা দরপতনে বিপর্যস্ত শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকারের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে বাজারের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা। এ জন্য প্রথমে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) পুনর্গঠন করে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। একসময় শেয়ারবাজারে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে তারল্য বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি বিবেচনায় নেওয়া এবং কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

রোববার রাজধানীর মতিঝিলে ডিএসইর পুরোনো ভবনের সামনে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) উদ্যোগে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এসব দাবি জানানো হয়। শেয়ারবাজারের অব্যাহত দরপতন ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনায় এ কর্মসূচির আয়োজন করে সংগঠনটি। এতে সভাপতিত্ব করেন বিসিএমআইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. ইসমাইল হোসেন। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম মানিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত ছিলেন।

মানববন্ধনে মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আইসিবিকে পুনর্গঠন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিতে সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সরকার থেকে নতুন করে ৫ হাজার কোটি টাকা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ অর্থ বাজারে তারল্য বাড়াতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বাজারের উত্থান-পতনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজনের সময় আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইসিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান কার্যক্রমে বাজারের দরপতন ঠেকানো যাচ্ছে না। এ কারণে আইসিবির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ট্রাস্টি প্রধানের পরিবর্তন করে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ১০ মিনিট সময় চান

বিসিএমআইএর সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম মানিক বলেন, দীর্ঘদিনের দরপতনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেক বিনিয়োগকারী তাঁদের সঞ্চয়ের বড় অংশ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শেয়ারবাজারের সংকট, বিনিয়োগকারীদের দুর্দশা এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর প্রস্তাবগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরতে চান তাঁরা।

এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চেয়ে ১০ মিনিট সময় চেয়েছে সংগঠনটি। নুরুল ইসলাম মানিক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পেলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা, আইসিবির মাধ্যমে বাজারে আর্থিক সহায়তা এবং শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরা হবে।

বিএসইসি-ডিএসইর কার্যক্রম নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভ

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে শেয়ারবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিনের দরপতনে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

বক্তাদের অভিযোগ, বিএসইসির বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ডিএসইর তদন্ত কার্যক্রমের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজার থেকে দূরে থাকছে। একসময় দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

তবে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরোধিতা করেননি বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এর নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হয়রানি করা হলে আস্থা ফিরবে না। নিয়ম মেনে বিনিয়োগকারীরা বড় অঙ্কের শেয়ার কিনলেও তাঁদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রমে সংযম এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

পাঁচ ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বরাদ্দের দাবি

মানববন্ধনে পাঁচটি ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারসংক্রান্ত ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্র করে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাই নতুনভাবে গঠিত সম্মিলিত ব্যাংকের শেয়ার ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

বিনিয়োগকারীদের মতে, ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্র করে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়লে তাঁদের ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবহারের প্রস্তাব

শেয়ারবাজারে তারল্যসংকট মোকাবিলায় সরকারি পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বিসিএমআইএর নেতারা। তাঁদের মতে, বাজারে তারল্য বাড়াতে ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থের কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ছাড়া ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) বাজারের কোম্পানিগুলো অবসায়নের জন্য পৃথক কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন তাঁরা। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, বাজারের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সংস্কার, কার্যকর তদারকি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে শেয়ারবাজারের চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ, আইসিবির মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা, নিয়ন্ত্রক ও বাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারে তারল্য বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হবে।