অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক :   শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও পুনঃপ্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আরপিও) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত বিধিতে ঋণ পরিশোধ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও অন্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা আরোপের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার তদারকিতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে পৃথক এসক্রো হিসাব ও নিরীক্ষিত প্রতিবেদন। একই সঙ্গে আইপিও আবেদনের আগেই কোম্পানির আর্থিক তথ্য গভীরভাবে যাচাইয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ...

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও পুনঃপ্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আরপিও) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রস্তাবিত বিধিতে ঋণ পরিশোধ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও অন্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা আরোপের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার তদারকিতে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে পৃথক এসক্রো হিসাব ও নিরীক্ষিত প্রতিবেদন। একই সঙ্গে আইপিও আবেদনের আগেই কোম্পানির আর্থিক তথ্য গভীরভাবে যাচাইয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য, শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের অপব্যবহার ও অনিয়মের ঝুঁকি কমানো।

আজ রোববার ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫’-এর খসড়া সংশোধনী জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে বিএসইসি। এতে মতামত, পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর শেষ সময় আগামী ২ নভেম্বর। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

খসড়া অনুযায়ী, পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ পরিশোধে এবং ৭০ শতাংশ যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ কিংবা ব্যবসা অধিগ্রহণে ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঋণের অর্থ নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যবসার ভারসাম্য রক্ষা, আধুনিকীকরণ, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণের (বিএমআরই) কাজে ব্যবহৃত হতে হবে। ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করতে হবে। পরিশোধযোগ্য ঋণ খেলাপি বা পুনঃতফসিলকৃত হতে পারবে না।

এ জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা প্রধান নির্বাহীর স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, যৌথ উদ্যোগ, সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বা ব্যবসা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের ধরন ও সম্ভাব্য সুবিধা প্রসপেক্টাসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। অর্থ সম্পূর্ণ ব্যবহারের ৯০ দিনের মধ্যে বিএসইসির প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত প্রতিবেদন কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

অর্থের ব্যবহারেও নজরদারি

আইপিও-আরপিওর অর্থ নির্ধারিত খাতের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করতে তফসিলি ব্যাংকে পৃথক এসক্রো হিসাব খোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা উদ্দেশ্য ছাড়া ওই হিসাবের অর্থ উত্তোলন বা ব্যবহার করা যাবে না। ফলে কোম্পানি অর্থ সংগ্রহের সময় যে উদ্দেশ্যের কথা জানাবে, বাস্তবে সেই উদ্দেশ্যেই অর্থ ব্যয় হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে।

আইপিও আবেদনের আগেই কমিশনের প্যানেলভুক্ত নিরীক্ষক দিয়ে কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে। এ যাচাইয়ে কোম্পানির আয়, পাওনা, মজুতপণ্য, ঋণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, করসংক্রান্ত বিষয়, আইনি ঝুঁকি এবং জালিয়াতির আশঙ্কা পর্যালোচনা করতে হবে। যাচাই প্রতিবেদন প্রসপেক্টাসে যুক্ত করার পাশাপাশি আবেদনপত্রের সঙ্গেও জমা দিতে হবে।

লোকসানি কোম্পানির আইপিওতে বাড়তি শর্ত

প্রস্তাবিত বিধিতে আইপিও আবেদনকারী কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক বছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা থাকা এবং আবেদনকালে পুঞ্জীভূত লোকসান না থাকার শর্ত রাখা হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান, অন্তত ৫০০ কোটি টাকার সম্পদসম্পন্ন মূলধননিবিড় কোম্পানি এবং নতুন প্রকল্পভিত্তিক কোম্পানিকে শর্তসাপেক্ষে ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির পর সাধারণত দুই বছরের মধ্যে মুনাফায় যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে।

শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ ও বরাদ্দেও পরিবর্তন

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণে অন্তত চারটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছে বিএসইসি। এর মধ্যে দুটি পরম এবং দুটি আপেক্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ও অনিবাসী বাংলাদেশিদের অতিরিক্ত চাহিদার ক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে শেয়ার বরাদ্দ এবং স্বয়ংক্রিয় বরাদ্দব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। লটারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও অ্যালগরিদম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মাধ্যমে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া আইপিও ও বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির সমন্বিত পদ্ধতিতে কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইপিওতে অন্তত ৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়তে হবে। উদ্যোক্তা বা বিদ্যমান শেয়ারধারীদের বিক্রির জন্য প্রতিশ্রুত শেয়ারের অন্তত ২৫ শতাংশ প্রথম লেনদেনের দিনে এবং অবশিষ্ট শেয়ার পরবর্তী ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে।

বড় বিনিয়োগকারীদের শেয়ারে বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের ৫০ শতাংশ প্রথম দিন থেকেই লেনদেনযোগ্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে ২৫ শতাংশ ৬০ দিন এবং আরও ২৫ শতাংশ ৯০ দিনের জন্য বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে।

কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের শেয়ারে দুই বছর এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের তারিখ থেকে তিন বছর অথবা তালিকাভুক্তির পর দুই বছর—যেটি পরে শেষ হবে, সেই সময় পর্যন্ত বিক্রয়-নিষেধাজ্ঞা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এসব পরিবর্তন এখনো চূড়ান্ত নয়। জনমত গ্রহণের পর মতামত ও আপত্তি পর্যালোচনা করে বিধিমালার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিএসইসি।