আইপিও ছাড়াই তালিকাভুক্তি, শেয়ারের দামে ২৫% ছাড় বাধ্যতামূলক
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়াই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে বড় কোম্পানিগুলো। এ জন্য বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। তবে শেয়ারের ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কমে। এ সুযোগ পেতে কোম্পানিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম, মুনাফা ও নগদ প্রবাহসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
এসব বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ ...
অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন শেয়ার ছাড়াই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে বড় কোম্পানিগুলো। এ জন্য বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে কোম্পানির অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। তবে শেয়ারের ন্যূনতম বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করতে হবে রেফারেন্স মূল্যের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ কমে। এ সুযোগ পেতে কোম্পানিকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম, মুনাফা ও নগদ প্রবাহসহ বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
এসব বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক এক্সচেঞ্জে সিকিউরিটিজের ডাইরেক্ট লিস্টিং) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গত ১৩ অক্টোবর বিধিমালাটি জারি করা হয়। রোববার (১৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়েছে। গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিধিমালাটি কার্যকর হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় সরকারি ও বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পগোষ্ঠী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি এবং নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে যোগ্য কোম্পানিগুলো আইপিও প্রক্রিয়ায় নতুন শেয়ার ইস্যু না করেই বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম সোমবার (১৯ অক্টোবর) আগামীর সময়কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিধিমালা অনুযায়ী, সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী কোম্পানিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে। কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার বা বিক্রয় আয় অন্তত এক হাজার কোটি টাকা থাকতে হবে। এ ছাড়া সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি এবং সম্পূর্ণ বা অন্তত ৫১ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিও এ সুবিধা পাবে। সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মালিকানা অন্তত ১০ শতাংশ রয়েছে, এমন কোম্পানিকেও এ সুযোগের আওতায় রাখা হয়েছে।
তবে তালিকাভুক্তির যোগ্যতা অর্জনে কোম্পানিকে অন্তত পাঁচ বছর ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। আগের দুই অর্থবছরে মূল ব্যবসা থেকে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সর্বশেষ অর্থবছরে পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ থাকতে হবে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী নিট সম্পদের পরিমাণ অন্তত ৫০০ কোটি টাকা হতে হবে। এ ছাড়া বিএসইসি নির্ধারিত অন্যান্য কোম্পানিকেও সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেওয়া যাবে।
শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে ২৫% ছাড়
নতুন বিধিমালায় সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে বিশেষ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। কোম্পানিকে মার্চেন্ট ব্যাংকারের সঙ্গে পরামর্শ করে শেয়ারের রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এ জন্য অন্তত দুটি মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এর মধ্যে একটি হতে হবে পরম মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং অন্যটি আপেক্ষিক মূল্যায়ন পদ্ধতি। কোম্পানির ব্যবসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট খাত বিবেচনায় মূল্যায়ন পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে এবং এর যৌক্তিকতাও প্রকাশ করতে হবে।
রেফারেন্স মূল্য নির্ধারণের পর শেয়ার বিক্রির ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্য বা ‘মিনিমাম আস্কিং প্রাইস’ ওই মূল্যের অন্তত ২৫ শতাংশ কম রাখতে হবে। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানির শেয়ারের রেফারেন্স মূল্য ১০০ টাকা হলে ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্য নির্ধারণ করতে হবে ৭৫ টাকা বা তার কম। তবে এ মূল্যই শেয়ারের চূড়ান্ত বাজারদর হবে না। প্রথম দিনের মূল্য আবিষ্কার পর্বে বিনিয়োগকারীদের দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে শেয়ারের বাজারদর নির্ধারিত হবে।
উদ্যোক্তাদের ৩০% শেয়ার ধরে রাখার শর্ত
বিধিমালায় তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়েও এ মালিকানা বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে, সরাসরি তালিকাভুক্তির আওতায় বিক্রির জন্য নির্ধারিত মোট শেয়ারের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কিনতে পারবেন।
এ ছাড়া বিক্রির জন্য নির্ধারিত শেয়ারের অন্তত ১০ শতাংশ প্রথম লেনদেন দিবস থেকে ৩০ লেনদেন দিবসের মধ্যে বিক্রি করতে হবে। তালিকাভুক্তির প্রথম দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা ওই কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবেন না। একই সঙ্গে তালিকাভুক্তির সময় হাতে থাকা শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি বিক্রির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিধিনিষেধ থাকবে।
প্রথম দিন দুই ঘণ্টা চলবে মূল্য আবিষ্কার
সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রথম দিন শেয়ারের দাম নির্ধারণে দুই ঘণ্টার মূল্য আবিষ্কার পর্ব থাকবে। এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার আদেশ দিতে পারবেন, তবে বিক্রেতারা কোনো বিক্রয়াদেশ দিতে পারবেন না। ন্যূনতম প্রস্তাবমূল্যের নিচে কোনো ক্রয়াদেশ গ্রহণ করা হবে না। মূল্য আবিষ্কার পর্ব শেষে বিক্রেতারা বাজারে পাওয়া সর্বোত্তম দরে শেয়ার বিক্রির আদেশ দিতে পারবেন। প্রথম দিন শেয়ারের ওপর কোনো সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হবে না।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রথম দুই লেনদেন দিবসে একক আদেশে ১০০টির কম বা এক হাজারের বেশি শেয়ার কেনার আদেশ গ্রহণ করা হবে না। এসব শর্তের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির শুরুতে শেয়ারের লেনদেন ও মূল্য নির্ধারণে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
১৫ কার্যদিবসে অনুমোদনের বিধান
সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করতে এক লাখ টাকা ফি দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো ঘাটতি থাকলে তা আবেদনকারীকে জানাতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জকে। সব শর্ত পূরণ হলে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দিতে হবে। এ ছাড়া অনুমোদিত তথ্য বিবরণী প্রথম লেনদেন শুরুর অন্তত ১০ দিন আগে প্রকাশ করতে হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা লেনদেন শুরুর আগেই কোম্পানির আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বর বিএসইসির ১০২৭তম কমিশন সভায় নতুন বিধিমালার খসড়া অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভার পর খসড়াটির ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারী, বাজার মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে লিখিত মতামত নেওয়া হয়। তবে সরবরাহ করা তথ্যে মতামত দেওয়ার সর্বশেষ সময় ১৫ নভেম্বর উল্লেখ থাকলেও বিধিমালাটি অক্টোবরেই জারি ও গেজেট প্রকাশের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারিখের অসংগতি রয়েছে, যা প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন বিধিমালার মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ২০১৫ সালের তালিকাভুক্তি প্রবিধানমালায় থাকা ডাইরেক্ট লিস্টিং-সংক্রান্ত ৮ থেকে ১৩ নম্বর প্রবিধান বাতিল করা হয়েছে। ফলে এখন থেকে সরাসরি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন বিধিমালার শর্ত অনুসরণ করতে হবে।
