দেশের উভয় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চ বেতন-ভাতা পেলেও তারা পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো আয় করতে পারছেন না। অথচ ১৩ বছর আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে অলাভজনক থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিল ডিএসই ও সিএসই। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটির মুনাফার বড় ভরসা হয়ে উঠেছে শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া অর্থ ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ এবং অন্যান্য আয়। অর্থাৎ, মূল ব্যবসায় লোকসান ...

দেশের উভয় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চ বেতন-ভাতা পেলেও তারা পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো আয় করতে পারছেন না। অথচ ১৩ বছর আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে অলাভজনক থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিল ডিএসই ও সিএসই। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটির মুনাফার বড় ভরসা হয়ে উঠেছে শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া অর্থ ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট (এফডিআর) ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ এবং অন্যান্য আয়। অর্থাৎ, মূল ব্যবসায় লোকসান থাকলেও বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুদের ওপর ভর করেই মুনাফা করছে স্টক এক্সচেঞ্জ দুটি। আর সেই সুদের একটি অংশ নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু শেয়ারহোল্ডাররা পাচ্ছেন নামমাত্র লভ্যাংশ।

শ্রমিকদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে শ্রম আইনে কোম্পানির মুনাফার উপর ৫ শতাংশ হারে ওয়াকার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠনের বিধান করা হয়েছে। তবে ডিএসইতে কোন শ্রমিক না থাকলেও এই ফান্ড গঠন করে কয়েক বছর ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কর্মকর্তারা। অথচ ব্যাংক, বিমা ও লিজিং কোম্পানিতে শ্রমিক নাই বিধায় এই ফান্ড গঠন করা হয় না।

ডিএসইর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ অর্থবছরে ডব্লিউপিপিএফ ফান্ড গঠন করে ডিএসই থেকে ৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২.৬৫ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭.৮৩ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯.০২ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫.৩৫ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.০৬ কোটি টাকা ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৪২ কোটি টাকা গঠন করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, ডব্লিউপিপিএফ গঠন করতে হয় পরিচালন মুনাফা হলে। পরিচালনা মুনাফা ছাড়া সুদের উপর এই ফান্ড গঠন করা আইনের ব্যত্যয়। সুদ আয়ের উপরতো কর্মকর্তাদের কোন ভূমিকা নেই। অতএব সেটার উপর ওই ফান্ড গঠন করে কর্মকর্তাদের নেওয়া ঠিক না। এটা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারহোল্ডারদের ভাবা উচিত।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, শ্রমিক নেই বলে ব্যাংকগুলো ডব্লিউপিপিএফ গঠন করে না। অথচ ডিএসই ব্যাংকের চেয়ে উচ্চ বেতনে রাখা কর্মকর্তাদের এই ফান্ড দেয়। সেটা আবার মূল ব্যবসায় কর্মকর্তারা মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পরেও। এটা যৌক্তিক না। অথচ ডিএসইর শেয়ারহোল্ডাররা দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে।

জানা গেছে, ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকার ডব্লিউপিপিএফ ফান্ড গঠন করা হলেও ওই অর্থবছরে স্টক এক্সচেঞ্জটির পরিচালন লোকসান হয় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরে ডিএসইর ১০১ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিচালন আয়ের বিপরীতে ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয় হয়েছিল।

তবে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালনের বাহিরে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিল থেকে সুদ আয় হয় ৯৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে অর্জিত ওই সুদ আয়ের উপর কর্মকর্তাদের জন্য ডব্লিউপিপিএফ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অথচ ওই সুদ আয় করতে ডিএসইর ৫৭৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার এফডিআর ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এছাড়া ট্রেজারি বন্ডে ২৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

সবশেষে ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা হয়েছে ৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১৭ পয়সা। তবে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিলে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ না থাকলে, লোকসান গুণতে হতো ডিএসইকে।

এ বিষয়ে ডিএসইর এক পরিচালক বলেন, ডিএসইর কর্মকর্তারা খুবই উচ্চ বেতনে চাকরী করেন। তারা বিনা সুদে গাড়ি ও বাড়ির ঋণ সুবিধা পান। এছাড়া ড্রাইভার, জ্বালানি ও রক্ষাবেক্ষণ সুবিধা পান। এরপরেও তারা ডব্লিউপিপিএফ এর নামে ৫ শতাংশ বাগিয়ে নিচ্ছেন। সেটা আবার শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ থেকে আসা সুদজনিত আয়ের উপর। অথচ যারা ডিএসইর মালিক, সেই শেয়ারহোল্ডাররা চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন। এমনকি কর্মী ছাটাই ছাড়াও কিছু ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হয়ে গেছে অর্থ সংকটে।

এদিকে সিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির ওই অর্থবছরে পরিচালন আয় হয় ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। এতে পরিচালন কার্যক্রমের লোকসান দাঁড়ায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। তবে ডিএসইর মতো সিএইতেও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ থেকে সুদজনিত আয় হয়েছে। যার পরিমাণ ছিল ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই সুদের উপরে সিএসইর কর্মকর্তা ডব্লিউপিপিএফের নামে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা ভাগ বসিয়েছে। অথচ এই সুদ আয়ে তাদের কোন ভূমিকা নেই।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থা চালু করে ডিএসই। এরপরে ২০১৩ সালে এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন প্রণয়নের পর ওই বছরের ২১ নভেম্বর ডিএসই ডিমিউচ্যুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের সদস্যপদ পৃথক করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হয়।

উল্লেখ্য ডিএসইর পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ৩৪২ জন কর্মকর্তার এই স্টক এক্সচেঞ্জটি ইতিহাসের এ যাবত মাত্র ৭৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা মুনাফা জমাতে (রিটেইন আর্নিংস) পেরেছে। এটা মুনাফা অর্জনের ব্যর্থতার কারনে হয়েছে। এ স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় শেয়ারহোল্ডারদের ১.৭০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে।

এসব ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ফোন রিসিভ করেননি এবং ম্যাসেজ দিলেও জবাব দেননি।