অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : অনেক বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের ঠকিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্তারা। তারা ব্যবসায় সাফল্য অর্জন ছাড়াই শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে অর্জিত সুদ থেকে ভাগভাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কর্তারাও। মূল ব্যবসায় লোকসান এবং পরিচালন আয় দিয়ে ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হলেও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ এফডিআর, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে পাওয়া সুদের আয়ে মুনাফা করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই মুনাফার ৫ ...

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : অনেক বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের ঠকিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্তারা। তারা ব্যবসায় সাফল্য অর্জন ছাড়াই শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে অর্জিত সুদ থেকে ভাগভাটোয়ারা করে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কর্তারাও। মূল ব্যবসায় লোকসান এবং পরিচালন আয় দিয়ে ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হলেও শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ এফডিআর, ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে পাওয়া সুদের আয়ে মুনাফা করছে প্রতিষ্ঠানটি। সেই মুনাফার ৫ শতাংশ আবার পাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অথচ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ।

সিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। এতে মূল ব্যবসায় লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অন্যদিকে ৪০০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এফডিআর ও ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে নিট সুদ আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। এই সুদ থেকে মুনাফায় অংশগ্রহণ ও কল্যাণ তহবিলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৯ লাখ টাকা। যার পরিমাণ এর আগের বছরে ছিল ২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুর রহমান মজুমদার বলেন, লেনদেন কম হওয়ায় পরিচালন লোকসান হচ্ছে। এটাতো কয়েক বছর ধরে হচ্ছে। তবে ডব্লিউপিপিএফ গঠনে আইনের ব্যত্যয় হয়নি। ব্যাংক-বিমার ক্ষেত্রে হয়তো এই ফান্ড গণ না করার জন্য অনুমোদন পেয়েছে, সে তালিকায় সিএসই নেই।

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল পরিচালন কার্যক্রমে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ৬০ লাখ ২ হাজার টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১০ কোটি ৬০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এক বছরে পরিচালন লোকসান বেড়েছে প্রায় ৩৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

মূল ব্যবসায় লোকসান হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে ব্যয় কমেনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মানবসম্পদ খাতে ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ১২ হাজার টাকা। আগের বছর এ ব্যয় ছিল ১৭ কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।

এর মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হয়েছে যথাক্রমে ১ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার ও ৪৫ লাখ ৯১ হাজার টাকা। অন্যান্য ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বোনাস, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড, চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধা বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। পরিচালকদের সম্মানী ও অন্যান্য ব্যয় ছিল ২১ লাখ ৮ হাজার টাকা।

সিএসইর মুনাফার প্রধান উৎস এখন বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সুদ আয় হয়েছে ৫০ কোটি ১৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এর বিপরীতে সুদ ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ফলে নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ৪৯ কোটি ৯ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।

এর মধ্যে ট্রেজারি বিল থেকে সুদ আয় হয়েছে ২৫ কোটি ১৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। এফডিআর থেকে এসেছে ১২ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এ ছাড়া এসটিডি হিসাব থেকে ৭ কোটি ৬৫ লাখ ৫৮ হাজার এবং জিরো কুপন বন্ড থেকে ৪ কোটি ৫৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা সুদ আয় হয়েছে।

অর্থাৎ মূল ব্যবসায় লোকসান থাকলেও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদসহ সামগ্রিক মুনাফার ভিত্তিতে কর্মীদের জন্য ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয়ের সুফল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেলেও তুলনামূলক কম লভ্যাংশ পাচ্ছেন শেয়ারহোল্ডাররা।

সিএসইর আর্থিক প্রতিবেদনের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা মেয়াদোত্তীর্ণ এফডিআরের অর্থ ফেরত না পাওয়া। নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে ১২ কোটি টাকা, ফিনিক্স ফাইন্যান্সে ১০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ৯ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ক্যাপিটালে ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা এফডিআর ছিল। এসব আমানতের মেয়াদ ২০২০ সালের মধ্যেই শেষ হলেও ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো অর্থ নগদায়ন হয়নি।

নিরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল থেকে ১ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা, প্রাইম ফাইন্যান্স থেকে ৮৪ লাখ টাকা এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ২ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। তবে হিসাব অনুযায়ী, এসব আমানতের বিপরীতে এখনো প্রায় ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নগদায়ন বাকি রয়েছে। এ ছাড়া এসব এফডিআরের বিপরীতে জমা হওয়া সুদের পরিমাণ ২ কোটি ৮৫ লাখ ১৭ হাজার টাকা।

পরিচালন আয় কমা, লোকসান বৃদ্ধি এবং সুদনির্ভর মুনাফার মধ্যেও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমিয়েছে সিএসই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে পরিচালনা পর্ষদ। আগের অর্থবছরে লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল ৫ শতাংশ।

সিএসইর পরিশোধিত মূলধন ৬৩৪ কোটি ৫২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির রিটেইনড আর্নিংস দাঁড়িয়েছে ৪৭ কোটি ৬৮ লাখ ২৪ হাজার টাকা। আগের অর্থবছর শেষে এ অঙ্ক ছিল ৫২ কোটি ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে আলোচ্য অর্থবছরে সিএসইর নিট মুনাফা হয়েছে ২৮ কোটি ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৩১ কোটি ৭০ লাখ ৯৩ হাজার টাকার তুলনায় ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। শেয়ারপ্রতি মুনাফাও ৫০ পয়সা থেকে কমে ৪৫ পয়সায় নেমেছে।