রাজীব ভুইয়া : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির সাম্প্রতিক শেয়ারদর ও আর্থিক ফলাফলের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ২৫ পয়সা। তারপরেও গত ৬ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০১ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

কোম্পানিটির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই মুনাফা ...

রাজীব ভুইয়া : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স পিএলসির সাম্প্রতিক শেয়ারদর ও আর্থিক ফলাফলের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ২৫ পয়সা। তারপরেও গত ৬ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০১ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

কোম্পানিটির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই মুনাফা ছিল ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত ৬ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ১০১ টাকা ৬০ পয়সা। ১৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ বৃদ্ধির পর শেয়ারটির দাম বর্তমানে ১৬৮ টাকা ৮০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ফলে কোম্পানির আর্থিক ফলাফলের তুলনায় শেয়ারদরের এই বড় উত্থান বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষভাবে নজর দেওয়ার মতো বিষয় হয়ে উঠেছে।

মুনাফা কমেছে ৩১ শতাংশ

নয় মাসে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের মুনাফা কমার পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি মুনাফাও খুবই কম অবস্থানে রয়েছে।৯ মাসে কোম্পানিটির নিট মুনাফা (কর-পরবর্তী) হয়েছে ১.২৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১.৮২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মুনাফা কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ। এর বিপরীতে শেয়ারদর ১৬৮ টাকা ৮০ পয়সা হওয়ায় কোম্পানিটির বাজারমূল্য ও আয়ক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

শেয়ারদরের এমন উত্থান টেকসই কি না, তা মূল্যায়নে কোম্পানির আয়, মুনাফা, নগদ প্রবাহ ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

পরিচালন কার্যক্রমে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক

কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ। নয় মাসে পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা হয়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই প্রবাহ ছিল ধনাত্মক ৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় মূল ব্যবসা থেকে নগদ অর্থপ্রবাহে বড় অবনতি হয়েছে। মুনাফার পাশাপাশি পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ অর্থপ্রবাহও দুর্বল হয়ে পড়ায় কোম্পানিটির কার্যক্রমের প্রকৃত নগদ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

আরও পড়ুন....

আয়ের বড় অংশই যাচ্ছে সুদে : নগদ সংকটে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ

দায়ের পরিমাণ ৮৫ কোটি টাকা

২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৮৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণ প্রায় ৫৬ শতাংশ।

এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ, ওভারড্রাফট ও অন্যান্য ঋণসুবিধা মিলিয়ে দায় রয়েছে ১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। একই সময়ে নগদ অর্থ, অগ্রিম ও আগাম পরিশোধসহ সংশ্লিষ্ট খাতে রয়েছে ৪৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এসব অর্থের একটি অংশ ব্যবসায়িক অগ্রিম, আমানত ও আগাম পরিশোধ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় পুরো অর্থকে তাৎক্ষণিক নগদ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

বিক্রি কমেছে, কমেছে মজুদও

কোম্পানিটির বিক্রয় আয়ও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের শেষে যেখানে বিক্রয় আয় ছিল ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

একই সময়ে মজুদের পরিমাণ ৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা থেকে কমে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মজুদ কমলেও বিক্রয় আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসার সম্প্রসারণ ও বিক্রয় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোম্পানিটির অবস্থান আরও বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

পরিচালন মুনাফার বড় অংশ চলে যাচ্ছে আর্থিক ব্যয়ে

নয় মাসে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর বিপরীতে আর্থিক ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ পরিচালন মুনাফার প্রায় ৬৯ শতাংশই আর্থিক ব্যয়ে চলে যাচ্ছে।

ঋণের বিপরীতে সুদ ও অন্যান্য আর্থিক ব্যয়ের চাপ বেশি থাকায় কর ও অন্যান্য ব্যয় পরিশোধের পর প্রকৃত মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আর্থিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না এলে মুনাফায় আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

আর্থিক ফলাফলের সঙ্গে শেয়ারদরের বড় ব্যবধান

সব মিলিয়ে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্সের নয় মাসের আর্থিক চিত্রে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে, পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে, বিক্রয় আয়ে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি নেই এবং আর্থিক ব্যয়ের চাপও উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে একই সময়ে শেয়ারদর বেড়েছে ১৫১ শতাংশের বেশি। ফলে কোম্পানিটির মৌলিক আর্থিক সূচকের সঙ্গে বাজারদরের এই ব্যবধান বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয়।

শেয়ারদর বৃদ্ধির পেছনে বাজারের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ ব্যবসা, কোম্পানি-সংক্রান্ত কোনো ইতিবাচক তথ্য কিংবা বাজারের চাহিদা—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে বর্তমান আর্থিক ফলাফলে সেই মাত্রার আয় বা মুনাফা বৃদ্ধির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় শুধু শেয়ারদরের সাম্প্রতিক উত্থান দেখে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোম্পানিটির আয়, ইপিএস, নগদ প্রবাহ, দায় ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা জরুরি। বিশেষ করে ১৬৮ টাকা ৮০ পয়সা বাজারদরের বিপরীতে নয় মাসের ইপিএস মাত্র ২৩ পয়সা হওয়ায় শেয়ারটির মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।