ঢাকা, বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২

ডমিনেজ স্টিল থেকে মতিউর চক্রের টাকা ছাড়া ১.০৭ কোটি প্লেসমেন্ট শেয়ার গ্রহণ!

২০২৬ জানুয়ারি ০৬ ০৯:২৪:১৭
ডমিনেজ স্টিল থেকে মতিউর চক্রের টাকা ছাড়া ১.০৭ কোটি প্লেসমেন্ট শেয়ার গ্রহণ!

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে আলোচিত প্লেসমেন্টহোল্ডার ছাগল কাণ্ডের মতিউর রহমান। যার নেতৃত্বাধীন চক্র বিভিন্ন দূর্বল ও অযোগ্য কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার দায়িত্ব হিসেবে টাকা ছাড়া কোটি কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়ে থাকে। যে কারনে এরইমধ্যে একমি পেস্টিসাইডসের শেয়ার নেওয়ার অপরাধে শাস্তি দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এই চক্রটি দূর্বল ডমিনেজ স্টিলকেও শেয়ারবাজারে এনেছে এবং টাকা ছাড়া ১ কোটি ৭ লাখ প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়েছে। যার দর ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

মতিউর রহমান আইপিও নিয়ে বিনা পয়সায় প্লেসমেন্ট শেয়ার নেওয়ার একটি চক্র। এরা নিজেদের সংশ্লিষ্ট ইস্যু ম্যানেজারের মাধ্যমে বিভিন্ন দূর্বল কোম্পানি কোম্পানির আর্থিক হিসাব ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে শেয়ারবাজারে আনে। এক্ষেত্রে তারা নামধারী নিরীক্ষকের সহযোগিতা নেয়। এক কথায় চক্রটি একটি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার পুরো দায়িত্ব নেয়। বিনিময়ে টাকা ছাড়া প্লেসমেন্ট শেয়ার নেয়। যেসব শেয়ার আইপিওতে আসার আগে ইস্যু করা হয়।

একইভাবে মতিউর চক্রের হাত ধরে শেয়ারবাজারে আসে ডমিনেজ স্টিল। আর্থিক হিসাবে মুনাফা ও সম্পদ অতিরঞ্জিত করে শেয়ারবাজারে আনা হয় এ কোম্পানিটিকে। এর বিনিময়ে কোম্পানিটি থেকে মতিউর চক্র ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকার শেয়ার নিয়েছে। এসব শেয়ারও একমি পেস্টিসাইডসের মতো টাকা ছাড়াই নিয়েছে বলে সন্দেহ সংশ্লিষ্টদের। যা তদন্ত করলেই একমি পেস্টিসাইডসের মতো আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক পরিচালক অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, মতিউর চক্রটি যে পুরো আইপিও প্রক্রিয়া করে, এ খবর অনেকেই জানে। তারা বিভিন্ন অযোগ্য কোম্পানির আর্থিক হিসাবকে কৃত্রিমভাবে সাজিয়ে শেয়ারবাজারে আনে। এর বিনিময়ে কোম্পানি থেকে শেয়ার নেয়। শুধু যে তারাই নেয়, এমনও না। কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালকেরাও নেয়। যার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে বিগত শিবলী কমিশন। তবে এখন সময় এসেছে সেসব অনিয়মের বিচার করা। এজন্য মতিউর চক্রের শেয়ার নেওয়া সব কোম্পানির বিষয়ে তদন্ত করা অতি জরুরী।

ডমিনেজ স্টিলকে শেয়ারবাজারে আনা ও প্লেসমেন্ট শেয়ার নেওয়ার জন্য আইপিওতে আবেদন দাখিলের আগে অস্বাভাবিকভাবে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়। কোম্পানিটির ওই সময় মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে (২০ মে ২০১৮-৩১ মার্চ ২০১৯) ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ কোটি টাকা করা হয়।

প্রসপেক্টাসের ২০ পৃষ্টা অনুযায়ি, ৬৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের প্রায় পুরোটাই বা ৯৯.৯৭ শতাংশ শেয়ারবাজারে আসার আগে ১০ মাসে ইস্যু করে ডমিনেজ। ওইসময় পরিচালকেরা নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের মধ্যে অনেক প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করে। এরপরে আইপিওতে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে।

ওই অস্বাভাবিক মূলধন বৃদ্ধির মধ্যে মো. মতিউর রহমান ৫.৫০ লাখ, মো. আফজাল হোসেন ৮.৭৫ লাখ, হেরিটেজ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ৯.৭৭ লাখ, জাভেদ এ মতিন ১.০০ লাখ, বেঙ্গল অ্যাসেটস হোল্ডিংস লিমিটেড ২১.৯৮ লাখ, চিটাগাং পেস্টিসাইডস অ্যান্ড ফিশারিজ লিমিটেড ৩০.০০ লাখ ও এসকে ট্রিমস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১০.০০ লাখ শেয়ার নেয়। এছাড়া মতিউরের মালিকানাধীন গ্লোবাল সুজ ১০ লাখ ও গ্লোবাল ম্যাক্স প্যাকেজিং ১০ লাখ প্লেসমেন্ট শেয়ার নেয়।

এরা একমি পেস্টিসাইডস থেকেও প্লেসমেন্ট শেয়ার নেয়। যার বিপরীতে কোন টাকা দেয়নি বলে বিএসইসির গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে বেরিয়ে আসে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদনটি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এছাড়া শেয়ারবাজারে আসার আগে একমি পেস্টসাইডের ইস্যু ম্যানেজার শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড প্রসপেক্টাসে মিথ্যা বা অসংগত তথ্য দাখিলের মাধ্যমে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রি-আইপিও-কালিন কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির বাস্তব আর্থিক অবস্থা সন্নিবেশিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে নিরীক্ষক শিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় এনফোর্সমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএসইসি।

একইভাবে ডমিনেজ স্টিলের আর্থিক হিসাবেও ইস্যু ম্যানেজার শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ও নিরীক্ষক আশরাফ উদ্দিন অ্যান্ড কোং তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেনি। যে কারনে আইপিওর আগে টানা মুনাফা বাড়তে থাকা কোম্পানিটি এখন নিয়মিত কমতে কমতে তলানিতে।

প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্য অনুযায়ি, কোম্পানিটির ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকার মুনাফা টানা বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হয় ৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এই টানা উত্থান কোম্পানিটির তালিকাভুক্ত হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। তবে এরপরেই ঘটে বিপত্তি। তালিকাভুক্ত হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরে মুনাফা দেখানো ১০ কোটি ৬৯ লাখ টাকার মুনাফা টানা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ৫১ লাখে।

এ বিষয়ে কোম্পানি থেকে পাঠানো এক মেইলে জানানো হয়, যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করার ক্ষমতা থাকেএবং আপনার উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারী অংশ বাদে অন্য কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না। এছাড়াও, আমাদের মুনাফার অবস্থান সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও আমরা ভিন্নমত পোষণ করি। উল্লেখ্য যে, ২০২১ সাল থেকে কোভিড-১৯ মহামারি এবং পরবর্তী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সকল ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতিতে মারাত্মকভাবে বাধা সৃষ্টি করেছে। এর ফলস্বরূপ, কোম্পানির নতুন প্রকল্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যা আমাদের মুনাফা ও অগ্রগতিকে প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে