ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১

সাড়ে ৩ বছরেই ভেঙ্গে পড়েছে শিবলী কমিশনের আইপিওর কোম্পানিগুলো

২০২৪ জানুয়ারি ১৮ ০৮:৩৫:১৭
সাড়ে ৩ বছরেই ভেঙ্গে পড়েছে শিবলী কমিশনের আইপিওর কোম্পানিগুলো

ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) : দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক যাচাই-বাছাই করে যোগ্য কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন দেওয়া হয় বলে দাবি করেছিলেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন। শুরুতে কয়েকটি কোম্পানির আইপিও আবেদন বাতিলের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা সেই দাবি বিশ্বাসও করে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই বিশ্বাসের কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই। তার কমিশন এখন দূর্বল ও অযোগ্য কোম্পানিকে আইপিও অনুমোদন দেয়। অথচ ভালো কোম্পানিকে আইপিও পেতে ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগ আছে।

দূর্বল ও অযোগ্য কোম্পানির আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তিতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পুরো শেয়ারবাজার। ওইসব কোম্পানি কিছুদিন না যেতেই ব্যবসায় যেমন পতনের খবর প্রকাশ করছে, একইভাবে দূর্বল লভ্যাংশ ঘোষণা করছে। যে শিবলী কমিশনের মাত্র সাড়ে ৩ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৮ শতাংশ কোম্পানির আইপিওর তুলনায় মুনাফা কমে এসেছে। এগুলোর মধ্যে কয়েক বছর পরে যে কত কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ বা অস্তিত্ব থাকবে না, তা অনুমেয়। এরইমধ্যে এসোসিয়েটেড অক্সিজেনের উৎপাদন বন্ধ পেয়েছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে ডিএসইর সাবেক পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, বর্তমান কমিশন করোনা মহামারির মতো ভয়াবহ সংকটকালীন সময় দায়িত্ব নিয়েছে। আর সেই সংকটের সময় মুনাফা দেখিয়ে শেয়ারবাজারে এসেছে ৪০টি কোম্পানি। এখন পরিস্থিতি আগের মতো ভয়াবহ নেই। এরপরেও যদি ৬৮ শতাংশ কোম্পানির মুনাফা কমে যায়, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক। এ থেকে বোঝা যায় বিগত সময়ের মতো গত সাড়ে ৩ বছরেও কৃত্রিম বা অতিরঞ্জিত মুনাফা দেখিয়ে আইপিওতে এসেছে বিভিন্ন কোম্পানি। যেগুলো এখন শেয়ারবাজারের জন্য বোঝা।

আইপিওকালীন কোম্পানিগুলো অতিরঞ্জিত আর্থিক হিসাব দিয়ে শেয়ারবাজারে আসে। যেখানে খালি চোখেই অনেক অনিয়ম দেখা গেছে। কিন্তু তারপরেও কমিশন সেসব কোম্পানির আইপিও দিয়েছে। এমনকি শুরুতে কিছু কোম্পানির আইপিও বাতিল করে দিয়ে যে আস্থা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কমিশন তৈরী করেছিল, সেগুলোকে পরবর্তিতে অনুমোদন দিয়ে অনাস্থার তৈরী করে। এক্ষেত্রে কমিশনের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার অভিযোগ আছে। তবে এ অনৈতিকতার সঙ্গে কমিশনের সবাই যে যুক্ত তা না, অনেকে প্রতিবাদও করে। কিন্তু সংখ্যালঘুর কারনে পেরে উঠে না।

শিবলী কমিশন একসময় ভালো কোম্পানির আইপিও দেয় বলে দাবি করলেও এখন আর তা করে না। তারা এখন এমন কোম্পানির আইপিও দেয়, যে কোম্পানি কোটি কোটি টাকার ভূয়া ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টবাবদ সম্পদ দেখায়। এমনকি চুক্তিভিত্তিক কাজ করায় একটি জাহাজ নির্মাণকারী কোম্পানির আইপিও বাতিল করলেও কন্ট্রাকটারের কাজ করা আরেক কোম্পানির অনুমোদন দিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করার উদাহরন আছে। এছাড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে অ্যাকাউন্টসের কোম্পানিও আইপিও অনুমোদন পেয়েছে এই কমিশনের সময়ে। এছাড়া অনিয়মের দায়ে শাস্তি দেওয়া কোম্পানিকে সেই অনিয়মের সাথেই টাকা তুলতে অনুমোদন দেওয়ার নজিরও আছে।

সম্প্রতি এসএমইতে টাকা উত্তোলনের আবেদনের আগে হুট করে অ্যাগ্রো অর্গানিকা ২৭ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি থেকে ৩৮ কোটি টাকা হয়ে যায়। এই অস্বাভাবিক মূলধন বৃদ্ধি করা হয়েছে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু দেখানো হয়েছে, যেগুলোর অস্তিত্বই নেই।

কমিশনের এমন কর্মকাণ্ডে অনেক আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিবলী কমিশনের আইপিও নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এছাড়া দূর্বল কোম্পানির আইপিও নিয়ে অনেক বাজার সংশ্লিষ্টরাও সমালোচনা করছেন। একইসঙ্গে লবিং ছাড়া ভালো কোম্পানিকে আইপিও পেতে গেলেও ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ আছে।

দেখা গেছে, শিবলী কমিশন ৪০টি কোম্পানিকে শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে (লেনদেন শুরু করেছে এমন কোম্পানি) ২ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা সংগ্রহের সুযোগ করে দিয়েছে। এরমধ্যে ৩০টি মূল মার্কেটে এবং ১০টি এসএমই মার্কেটে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মূল মার্কেটের ৩০টির মধ্যে ৭টি কোম্পানি প্রিমিয়ামে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

শিবলী কমিশনের সাড়ে ৩ বছরেই ৫ কোম্পানির শেয়ার দর এখন ইস্যু মূল্যের নিচে। এরমধ্যে আবার শুধুমাত্র অভিহিত মূল্যে তালিকাভুক্ত হওয়া ২টি কোম্পানি রয়েছে। তবে আরও কিছু কোম্পানির শেয়ার দর ইস্যু মূল্যের নিচে নামার অপেক্ষায় রয়েছে। যেগুলোকে কৃত্রিমভাবে ফ্লোর প্রাইস দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে।

ইস্যু মূল্যের নিচে নেমে আসা কোম্পানিগুলো-

সম্প্রতি জমির জাল দলিল, মিথ্যা আর্থিক প্রতিবেদন এবং শেয়ারের অর্থ জমার দেওয়ার মিথ্যা বিবৃতির কারনে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়া স্থগিত থাকা এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও ইস্যু ম্যানেজারকে বড় জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই প্রতারক কোম্পানিটির জালিয়াতি থাকা অবস্থাতেই আইপিওর উপর স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে বিরল নজির স্থাপন করেছে বিএসইসি। যে কোম্পানিটির ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারিত হয়েছিল, সেই কাট-অফ প্রাইস দিয়েই অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছে।

বিএসইসির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এশিয়াটিক ল্যাবের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিএসইসি কোম্পানিটিকে ৯৫ কোটি টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দিয়েছে। এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি কমিশন আইপিও আবেদনের আগ মুহূর্তে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল।

অথচ সম্প্রতি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের প্রত্যেক পরিচালককে ৫০ লাখ টাকা করে জরিমানা করে বিএসইসি। এছাড়া কোম্পানিটির ইস্যু ম্যানেজার শাহজালাল ইক্যুইটিকে ৫০ লাখ, কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কোম্পানি সচিবকে ২৫ লাখ টাকা করে এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আরও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করে। এতে মোট ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

শুরুতে আইপিও নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল শিবলী কমিশন। যার অস্তিত্ব এখন নেই। ফলে অনেক যাচাই-বাছাই করে ভালো কোম্পানির আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা শিবলী কমিশনের ৪০টির মধ্যে ২৭টি বা ৬৭.৫০ শতাংশ কোম্পানিরই মুনাফা কমে এসেছে। এরমধ্যে বুক বিল্ডিং, ফিক্সড প্রাইস, বীমা, এসএমইসহ সব খাতের কোম্পানির মুনাফা কমেছে।

সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে বুক বিল্ডিংয়ে প্রিমিয়াম নিয়ে শেয়ারবাজারে আসা এনার্জিপ্যাক পাওয়ার ও বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার। ৩২ টাকা করে প্রতিটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২২৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী এ কোম্পানিটির সর্বশেষ বছরে শেয়ারপ্রতি (১.০৬) টাকা করে লোকসান হয়েছে। আর এনার্জিপ্যাকের শেয়ারপ্রতি (২.৩৬) টাকা লোকসান হয়েছে।

ব্যবসায় পতনের কারন হিসেবে বারাকা পতেঙ্গা কর্তৃপক্ষ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় জনিত লোকসানকে উল্লেখ করেছে। আর বিক্রি কমে আসায় মুনাফায় পতন হয়েছে বলে জানিয়েছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার।

নিম্নে মুনাফা কমে আসা কোম্পানিগুলোর তথ্য তুলে ধরা হল-

*এক্ষেত্রে আইপিওকালীন যত মাসের ইপিএস দেখানো হয়েছিল, তুলনার জন্য সর্বশেষ একই সময়ের ইপিএস নেওয়া হয়েছে।

*এসএমই কোম্পানিগুলোর প্রান্তিক হিসাব প্রকাশ করা হয় না। তাই তুলনার জন্য বছরের ইপিএস নেওয়া হয়েছে। তারপরেও আগের কম সময়ের তুলনায় পুরো বছরে গিয়ে ইপিএস কম হয়েছে।

*কৃষিবীদ সীডের আইপিওকালীন ৩ মাসে ইপিএস দেখানো হয়েছিল ০.৬০ টাকা। যে কোম্পানিটির সর্বশেষ অর্থবছরে বা ১২ মাসে হয়েছে ০.৭৭ টাকা। কিন্তু প্রতি প্রান্তিকে ০.৬০ টাকা বিবেচনায় বছরে ২.৪০ টাকা ইপিএস হয়।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে