ঢাকা, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

বিজিআইসিতে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা

২০২৬ জুলাই ২৬ ০৮:৩৮:১৭
বিজিআইসিতে লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডাররা

দেশের প্রথম বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানি বাংলাদেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি (বিজিআইসি)-তে দুই বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বীমা আইনের বিধান ও আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস) লঙ্ঘনের পাশাপাশি কর্মীদের আইনগত প্রাপ্য সুবিধা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে কোম্পানির মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শেয়ারহোল্ডারদের প্রাপ্য লভ্যাংশের ওপর। অথচ অতিরিক্ত ব্যয়ের সুবিধা ভোগ করেছে মূলত কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ও কর্মচারীরা।

বিজিআইসি দেশের প্রথম বেসরকারী সাধারন বীমা কোম্পানি। ৪০ বছর আগে (১৯৮৫) প্রতিষ্ঠিত এই পুরাতন বীমা কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার কারনে ব্যবসায় উন্নতি নেই। এতো বছর আগের কোম্পানিটির মুনাফা ও লভ্যাংশ খুবই সাদামাটা।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ি, গত ৭ বছরের মধ্যে ২০২১ সালে বিজিআইসির সর্বোচ্চ ১.৯২ টাকা শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছিল এবং ওই বছরের জন্য সর্বোচ্চ ১২.৫০% নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়। যে কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২৫ সালে ইপিএস হয়েছে ১.৫১ টাকা এবং লভ্যাংশ দেওয়া হবে ১১% নগদ।

কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিজিআইসি কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালে আইডিআরএ’র এসআরও নং ২৮০-ল/২০১৮-তে বর্ণিত সীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ম্যানেজমেন্ট ব্যয় করেছে। তারা বেধেঁ দেওয়া সীমার থেকে ৭.৭১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ম্যানেজমেন্ট ব্যয় করেছে। এর আগের বছর বেধেঁ দেওয়া সীমার থেকে ১০.৩৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ম্যানেজমেন্ট ব্যয় করেছিল।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কোম্পানিটির ২০২৫ সালে ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ, যা নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স রুলস, ২০১৮ অনুযায়ী নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে। বিধি অনুসারে কোম্পানিটির জন্য অনুমোদিত সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ছিল ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ফলে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যবস্থাপনা ব্যয় করা হয়েছে বলে আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজিআইসি কর্তৃপক্ষের অনিয়মের মাধ্যমে দুই বছরে ১৮ কোটি ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কারনে কোম্পানিটির অনেকটা সমপরিমাণ মুনাফা কম হয়েছে। যা কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি ৩.৩৪ টাকা মুনাফার সমান। বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ যদি অনিয়ম না করতো, তাহলে কোম্পানিটির দুই বছরের মুনাফা ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা হতো।

বিজিআইসি ম্যানেজমেন্টের এই অনিয়মের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মালিক তথা শেয়ারহোল্ডাররা। তারা আইন বর্হিভূত অতিরিক্ত ব্যয় না করলে, শেয়ারহোল্ডাররা অনেক বেশি লভ্যাংশ পেত। অথচ তাদের অনিয়মে কোম্পানিটিতে বঞ্চিত হচ্ছেন মালিকেরা এবং লাভবান হচ্ছেন কর্মীরা।

অথচ এই কোম্পানি কর্তৃপক্ষ শ্রম আইন পরিপালন করছে না। এর মাধ্যমে প্রতারণা করছেন কোম্পানিটির কর্মীদের সঙ্গে।

২০০৬ সালের শ্রম আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ি, প্রতিটি কোম্পানিতে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন করা এবং তা পরবর্তী ৯ মাসের কর্মীদের মধ্যে বিতরন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ তা না করে কর্মীদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন।

তবে বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আইনটি কার্যকর না করার বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিএফআইডি। এছাড়া বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনও আবেদন করেছে। এরপরে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বীমা খাতে ডব্লিউপিপিএফ করতে হবে না, এমন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তা সত্ত্বেও আইন অনুযায়ি ফান্ড গঠন করেনি বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ।

এ কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবে বিবরণীর নোট নম্বর ১৮.০০ অনুযায়ী, অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে বীমা ব্যবসা সংক্রান্ত পাওনা হিসেবে ৪৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে নোট নম্বর ১২.০০ অনুযায়ী, অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বীমা ব্যবসা সংক্রান্ত দায় হিসেবে ৬৬ লাখ টাকা হিসাবভুক্ত রয়েছে। তবে এসব পাওনা ও দায়ের অঙ্ক সংশ্লিষ্ট তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এখনো নিশ্চিত বা কনফার্ম করা হয়নি বলে আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক।

আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস) লঙ্ঘন করতেও ছাড়েনি বিজিআইসি কর্তৃপক্ষ। তারা গ্র্যাচ্যুইটি ফান্ড গঠন করলেও অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন করেনি। যা আইএএস ১৯ এর লঙ্ঘন। এছাড়া কোম্পানিটির গ্র্যাচুইটি ফান্ড এখনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক স্বীকৃত হয়নি।

বিজিআইসি থেকে ‘ফিক্সড ডিপোজিট হিসাব’ মোট ৯০ কোটি ৪৪ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা দেখিয়েছে। এর মধ্যে অ্যাভিভা ফাইন্যান্স পিএলসিতে ৩৫ লাখ টাকা এবং পদ্মা ব্যাংক পিএলসিতে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব অর্থ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বিজিআইসি কোনো ধরনের অবচয় ক্ষতি (ইম্পেয়ারমেন্ট লস) বা প্রভিশন স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে প্রযোজ্য আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড অনুযায়ী পরিমাপ ও স্বীকৃতির শর্ত পালন না করায় কোম্পানির চলতি সম্পদ এবং রিটেইনড আর্নিংস ৬০ লাখ টাকা অতিরঞ্জিতভাবে প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া আর্থিক বিবরণীর নোট নম্বর ৩.২৩ (ক) অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ডের অডিট রিপোর্ট অনুপস্থিত থাকায় বাজেয়াপ্ত (ফরফেইটেড) অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেনি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা। ফলে প্রভিডেন্ট ফান্ড সংশ্লিষ্ট এই হিসাব সংক্রান্ত তথ্য অনিশ্চিত রয়ে গেছে বলে আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে বিজিআইসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ সাইফুদ্দিন চৌধুরী আগামীর সময়কে জানালেন, প্রথম বীমা কোম্পানি হিসেবে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২০-৩০ বছর ধরে কর্মরত থাকায় তাদের বেতন-ভাতা তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যাতায়াত, রেজিস্ট্রেশন ফি, অডিট ফি ও মনিহারি দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মূলত এই অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া বিজিআইসির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৪ কোটি ৩ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৬৬.৬০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের হাতে। শনিবার (২৫ জুলাই) কোম্পানিটির শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ৩৮.৫০ টাকায়।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন