ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

সালমান শাহ, যাঁর জন্য সময় থমকে আছে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯ ০৯:২৬:১১
সালমান শাহ, যাঁর জন্য সময় থমকে আছে

বিনোদন প্রতিবেদক : কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের সময়টা থেকে যায়। কিছু মুখ পর্দা থেকে হারিয়ে যায়, কিন্তু দর্শকের স্মৃতি থেকে নয়। সালমান শাহ তেমনই এক নাম। ঢাকাই সিনেমার আকাশে তাঁর উপস্থিতি ছিল খুব অল্প সময়ের। মাত্র কয়েক বছর। অথচ সেই সময়টুকুই তাঁকে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে তিন দশক পরও তাঁকে নিয়ে মানুষের আবেগে কোনো ভাটা নেই।

১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম সালমান শাহর। আজ তাঁর জন্মদিন। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। পরে ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক। প্রথম সিনেমাতেই মৌসুমীর বিপরীতে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তিনি।

এরপর যেন সবকিছুই ঘটতে থাকে খুব দ্রুত। একের পর এক সিনেমা, জনপ্রিয় গান, নতুন নতুন চরিত্র—আর প্রতিটি সিনেমার সঙ্গে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা। ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘আনন্দ অশ্রু’—একসময় সালমান শাহর সিনেমা মানেই ছিল দর্শকের আলাদা আগ্রহ।

মাত্র তিন-চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে অভিনয় করেছিলেন ২৭টি সিনেমায়। সংখ্যাটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু তাঁর প্রভাবের হিসাব সংখ্যায় মাপা কঠিন।

সালমান শাহর বিশেষত্ব শুধু তাঁর অভিনয়ে ছিল না। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকা এক তারকা। পোশাক, চুলের কাট, সানগ্লাস, ব্যান্ডানা, জিনস-টি-শার্ট কিংবা মোটরবাইকে তাঁর উপস্থিতি—সবকিছুতেই ছিল আলাদা একটা স্বাচ্ছন্দ্য। নব্বইয়ের দশকের তরুণেরা তাঁকে শুধু সিনেমার নায়ক হিসেবে দেখেনি; অনেকে অনুসরণ করেছে তাঁর পোশাক, চুলের স্টাইল ও ব্যক্তিত্বও।

তাঁর হাসিটাও ছিল আলাদা। পর্দায় তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, সহজ-স্বাভাবিক অভিনয় আর রোমান্টিক নায়কসুলভ অভিব্যক্তি খুব দ্রুত তাঁকে দর্শকের আপন করে নেয়। মনে হতো, তিনি যেন পর্দার মানুষ নন—আমাদেরই সময়ের, আমাদেরই চেনা একজন।

কিন্তু সেই সময়টা থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। মাত্র ২৫ বছর বয়সে চলে যান সালমান শাহ। যে বয়সে একজন শিল্পীর সামনে পড়ে থাকে আরও অনেক চরিত্র, আরও অনেক গল্প, আরও অনেক সম্ভাবনা, সেই বয়সেই থেমে যায় তাঁর জীবন।

তাঁর চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে ৩০ বছর। এই সময়ে বদলে গেছে বাংলা চলচ্চিত্র। বদলেছে নায়ক, বদলেছে দর্শকের রুচি, বদলেছে সিনেমা দেখার মাধ্যম। কিন্তু সালমান শাহ যেন বদলাননি। পুরোনো সিনেমার দৃশ্যে তাঁকে দেখলে এখনো অনেক দর্শকের মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা।

নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁকে দেখেছে তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরে। তবু তারাও তাঁকে ভালোবেসেছে। ইউটিউব, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পুরোনো ছবি ও গান ফিরে ফিরে আসে। জন্মদিন কিংবা মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়। তাঁর সিনেমার দৃশ্য, পোশাক কিংবা সংলাপ আবারও ছড়িয়ে পড়ে নতুন দর্শকের মধ্যে।

হয়তো এটাই একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—সময় তাঁকে সরিয়ে নিতে পারেনি।

সালমান শাহর জীবন ছিল ছোট। চলচ্চিত্রজীবন ছিল আরও ছোট। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি দীর্ঘ। তিনি নেই, অথচ তাঁর সিনেমা আছে। তাঁর গান আছে। তাঁর হাসি আছে। আর আছে এমন এক প্রজন্মের ভালোবাসা, যে প্রজন্ম তাঁকে হারানোর পরও ভুলতে পারেনি।

তাই সালমান শাহ শুধু নব্বইয়ের দশকের একজন জনপ্রিয় নায়ক নন। তিনি এমন এক স্মৃতি, যাঁর বয়স বাড়ে না। তিন দশক পেরিয়েও যাঁকে দেখলে মনে হয়—সালমান শাহ বুঝি এখনো সেই তরুণ, সবে সিনেমার পর্দায় এসেছেন; আর তাঁর জন্য সময়টা সেখানেই থেমে আছে।

পাঠকের মতামত:

বিনোদন এর সর্বশেষ খবর

বিনোদন - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন