ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

১৫ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১০ ০৮:৩৫:৪১
১৫ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা

সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক

জনতা ব্যাংকে ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন খেলাপি

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় তৈরি হওয়া সংকট এবার বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ বেড়েছে। কিন্তু আয় কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক সেই প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারছে না। ফলে চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এত বড় প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতার বড় সংকেত। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের ঘাটতি বিপুল, সেসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন সক্ষমতা ও আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংকের মোট প্রভিশন ঘাটতি ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের—৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের ১০টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি। একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের—৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১১ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা।

ঋণের এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি

ব্যাংকগুলোর প্রভিশন সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে উঠেছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি। সহজ হিসাবে, ব্যাংকগুলো যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। এর বড় অংশই আদায় অনিশ্চিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ না থাকলে প্রভিশন ঘাটতিও থাকে না। কিন্তু খেলাপিদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং প্রভিশন ঘাটতি থাকার পরও লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ রাখার মতো সিদ্ধান্ত ব্যাংকিং খাতে ভুল বার্তা দিচ্ছে।

তাঁর মতে, এ ধরনের নীতির পরিণতিতে আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সংকট কাটাতে ক্ষতিকর নীতিমালা বাতিলের পাশাপাশি ঋণ আদায় ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনিয়মের ঋণ এখন বোঝা

ব্যাংক খাতের সংকটের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণকে দায়ী করেছেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ’-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানারত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যবসায়ী লুটপাটের উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছেন এবং বছরের পর বছর তা ফেরত দেননি। অন্যদিকে এসব খেলাপিকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে ঋণ পরিশোধ না করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

তাঁর মতে, অনিয়ম ও খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণেই ব্যাংকগুলো এখন নাজুক অবস্থায় পড়েছে। ব্যাংক খাত ও আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বড় খেলাপিদের প্রতি ছাড় বন্ধ করে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রভিশন ঘাটতিতে বাড়ছে মূলধন ঝুঁকি

আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঋণের মান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। সাধারণ ঋণের ক্ষেত্রে দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ, নিম্নমানের খেলাপি ঋণে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা লোকসানি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।

কোনো ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকলে তার আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রভিশন ঘাটতি কমানোর স্থায়ী সমাধান হলো খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণ আদায় বাড়ানো। নতুন করে ঋণ বিতরণের চেয়ে বিদ্যমান ঋণের গুণগত মান ও আদায় সক্ষমতার দিকে নজর না দিলে ব্যাংক খাতের এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

পাঠকের মতামত:

ব্যাংক এর সর্বশেষ খবর

ব্যাংক - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন