ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২

প্রশ্নবিদ্ধ করতে অযৌক্তিক সমালোচনা

গভর্নর মোস্তাকুর রহমান কি আসলেই ঋণখেলাপি?

২০২৬ মার্চ ১০ ১০:১৪:৫৬
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান কি আসলেই ঋণখেলাপি?

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোস্তাকুর রহমান। এরপর থেকে তাকে বিতর্কিত করতে পেছনে লেগেছে একটি মহল। যার সুযোগ করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে বিতর্কিতভাবে অপসারণ করার ফলে এই পরিস্থিতির তৈরী হয়েছে। অনেকেই আহসান মনসুরের অপসারণকে মেনে নিতে না পারায় এই সরকারের নিয়োগকে বিতর্কিত করতে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন অযৌক্তিক বিষয়াদি সামনে তুলে আনছেন।

এরমধ্যে অন্যতম মোস্তাকুর রহমান ঋণ খেলাপি ও শেয়ারবাজারের ইনটেক কোম্পানির শেয়ার ধারন নিয়ে এসআলমের সঙ্গে সর্ম্পৃক্ত। কিন্তু দুটির কোনটিতেই মোস্তাকুর রহমানকে দায়ী করা যায় না।

এসব বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, কেউ যদি সরকারের নীতি সহায়তা নেয়, তাকেতো আপনি ঋণখেলাপি বলতে পারেন না। তারপরেও নতুন গভর্নরকে কেউ কেউ খেলাপি বলার চেষ্টা করছেন সমালোচনা করতে হবে তাই। এছাড়া গভর্নর ইনটেক কোম্পানির প্রায় সব শেয়ার অনেক আগে ছেড়ে দিয়েছে, আর এস.আলম গ্রুপ সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কিনে কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এটা নিয়েও কেউ কেউ না বুঝে সমালোচনা করছে। সবসময় একটা শ্রেণী থাকবেই, যারা কিছু না কিছু নিয়ে সমালোচনা করবে। তবে সত্যি যদি যৌক্তিক কোন অনিয়ম থেকে থাকে, সেটা তুলে ধরতে হবে।

মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে যোগদানের আগে হেরা সোয়েটারস লিমিটেডে (এইচএসএল) মালিকানায় যুক্ত ও কর্মরত ছিলেন। এটি একটি ১০০% রপ্তানিমুখী, লিড গোল্ড সার্টিফাইড সোয়েটার উৎপাদন কারখানা। কোম্পানিটি ২০১৯ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে, যার মধ্যে রয়েছে উন্নতমানের জার্মান স্টোল স্বয়ংক্রিয় জ্যাকোয়ার্ড মেশিন।

কার্যক্রম শুরু করার এক বছরের মধ্যে, কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে, যার ফলে এইচএসএলের রপ্তানি আদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। যা ২০২২ সালে কোম্পানিটি কাটিয়ে উঠার শুরু করার সাথে সাথে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সূত্রপাত এবং এর ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা আবারও ব্যবসায়িক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

এই বহিরাগত ধাক্কা সত্ত্বেও এইচএসএল আর্থিক দায়বদ্ধতা কাটানোর জন্য দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বদ্ধ ছিল। এরমধ্যে কোম্পানিটি বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পের অধীনে ৩১ কোটি ৮০ লাখ টাকার গ্রিন ফাইন্যান্স ঋণ সম্পূর্ণরূপে সমন্বয় করেছে এবং তার যন্ত্রপাতি মেয়াদী ঋণ অ্যাকাউন্টে ৫০ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।

এছাড়া সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও, কোম্পানিটির কার্যক্রম একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি।

এরমধ্যে নীতি সহায়তা সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার আওতায় হেরা সোয়েটার কর্তৃপক্ষ ঋণ পরিশোধ সহজ করার জন্য মেয়াদী ঋণ পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করে। এটাকেই ঋণ খেলাপি হিসেবে কেউ কেউ অপপ্রচার চালায়। অথচ কোম্পানিটি কোনও সুদ মওকুফ চায়নি বা গ্রহণ করেনি এবং নির্ধারিত হারে নিয়মিত সুদ পরিশোধ করে আসছে।

এ কোম্পানিটির মালিকানায় যুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোঃ মোস্তাকুর রহমান। তার কোম্পানিটিতে ২৩% শেয়ারের মালিকানা রয়েছে। বাকি ৭৭% শেয়ারের মালিকানা সিনাম ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড এবং অন্যান্যদের। এর বাহিরে মোঃ মোস্তাকুর রহমান এবং সিনাম ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের পরিচালকদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই।

ইনটেক লিমিটেড :

ইনটেক বিশ্লেষণ করে দেখে গেছে, গত ২০ বছর ধরে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা বা নীতিনির্ধারণে মোস্তাকুর রহমানের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। ২০০৬ সালের পর থেকেই তিনি কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না। যদিও ২০০২ সালে ইনটেক অনলাইন যখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন এর প্রধান উদ্যোক্তা ও ৬৬.৩৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।

তবে বিগত ১৫ বছরের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী মোস্তাকুর রহমানের প্রস্থানের পর বিভিন্ন সময়ে ইনটেক অনলাইনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মো. আশিকুর রহমান, মোসলেহউদ্দিন আহমেদ এবং এটিএম মাহবুবুল আলমসহ আরও কয়েকজন। বর্তমানে কোম্পানিতে গভর্নরের শেয়ারের পরিমাণ মাত্র ০.৫০ শতাংশ। তবে এই শেয়ার রাখতেও তিনি বাধ্য হয়েছেন আইনগত জটিলতায়।

শেয়ারবাজারের কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত শেয়ার ধারণের পরিমাণ ৩০ শতাংশের বেশি না থাকলে, তাঁরা কোনো শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না, যে কারণে ০.৫০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির সুযোগ নেই মোস্তাকুর রহমানের।

তবে এই শেয়ারধারন দিয়ে মোস্তাকুর রহমানের এসআলমের সর্ম্পক্য রয়েছে বলে কেউ কেউ গুজব ছড়িয়েছে। ইনটেক লিমিটেডের বর্তমানে এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম লাবুর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লাবুর ছেলে আতিকুল আলম চৌধুরী হলেন ইনটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং লাবুর ছেলের স্ত্রী হলেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের মেয়ে জেবা জামান চৌধুরী।

দেখে গেছে, এস আলম গ্রুপের কাছে ইনটেক অনলাইনের নিয়ন্ত্রণ স্থানান্তর হয় মূলত ২০২০-২১ অর্থবছরে, যা মোস্তাকুর রহমান প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে যাওয়ার অন্তত দেড় দশক পরের ঘটনা। ফলে বর্তমান গভর্নরের দাপ্তরিক অবস্থানের সঙ্গে এসআলম নিয়ন্ত্রিত ইনটেক অনলাইনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র নেই।

২০২০-২১ হিসাববছরে ইনটেক অনলাইনের চেয়ারম্যান হন আতিকুল আলম চৌধুরী, যিনি এস আলম গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং এস আলমের ছোট ভাই আবদুস সালাম লাবুর ছেলে। তবে ২০২৩-২৪ হিসাববছর থেকে পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন খন্দকার সাকিব আহমেদ এবং পরিচালক হিসেবে এখনও বহাল রয়েছেন এস আলম পরিবারের সদস্য আতিকুল আলম চৌধুরী।

পাঠকের মতামত:

ব্যাংক এর সর্বশেষ খবর

ব্যাংক - এর সব খবর



রে