ঢাকা, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২

২০৭ চেকের মাধ্যমে ফরচুন সুজ থেকে ৭৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে মিজানুর চক্র

২০২৬ মার্চ ০৮ ১০:৪৮:৫২
২০৭ চেকের মাধ্যমে ফরচুন সুজ থেকে ৭৬ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে মিজানুর চক্র

ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) :শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন সুজ। ১৭১ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ কোম্পানিটিতে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতিত) মালিকানা ৬৯.০৭ শতাংশ। এই কোম্পানিটি থেকে ২০৭টি চেকের মাধ্যমে ৭৬ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চক্র। এর মাধ্যমে অনেকটা ফাঁকা করে দেওয়া হয়েছে কোম্পানিটিকে।

কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

এ কোম্পানিটির পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে মো. মিজানুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রোকসানা রহমান রয়েছেন। এছাড়া পর্ষদে শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হিসেবে রয়েছেন- আমানুর রহমান ও মো. রবিউল ইসলাম।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ফরচুন সুজ কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২০৭টি চেকের মাধ্যমে ‘২০৫০১১১০১০০২৪৭৯১২’ হিসাব থেকে নগদ ৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। যা যথাযথ এবং পর্যাপ্ত নথি, রেকর্ড এবং প্রমাণের অভাবে (যেমন ব্যাংক বই, ক্যাশ বই, চেক বই, চেক কাউন্টারফয়েল, চেকের ফটোকপি, ইনভয়েস, বিল, ডেলিভারি চালান) নিরীক্ষক ওই অর্থ কোম্পানির ব্যবসায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে, এমন কোন প্রমাণ পাননি। এছাড়াও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে ক্যাশ বই সরবরাহ করেনি।

এ বিষয়ে হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, কোম্পানিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং দূর্ণীতি ঠেকাতে নগদ লেনদেন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ৭৬ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন ভালো লক্ষণ না। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এটাকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের টাকা আত্মসাৎ ছাড়া অন্যকোন কারন নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে ফরচুন সুজের ২০২২ সালে অগ্নিকান্ডে কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য ক্ষতি হয়েছিল ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির কাছে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতির দাবি করে ফরচুন সুজ কর্তৃপক্ষ। এরমধ্যে তাকাফুল ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের কাছে ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং প্রাইম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার টাকার কন্টিনজেন্ট সম্পদ দেখিয়েছে।

তবে বীমা দাবি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২৪ এর অনুচ্ছেদ ০৫ (০৮) অনুসারে, দাবি দাখিলের ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি নিষ্পত্তি করতে হয়। কিন্তু প্রায় ৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও বীমা কোম্পানিগুলি এখনো ফরচুন সুজের সেই দাবি নিষ্পত্তি করেনি। যে অর্থ আদায়যোগ্য বলে মনে হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

ফরচুন সুজের জন্য ২০২২, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে লভ্যাংশ ঘোষণা এবং অনুমোদন করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী প্রাইম ব্যাংকে লভ্যাংশের অর্থ রাখার জন্য পৃথক অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। তবে ওই ৩ বছরের লভ্যাংশের সম্পূর্ণ পরিমাণ এই অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়নি। ফলস্বরূপ, আইন অনুসারে অনুমোদিত লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি। এতে কোম্পানিটিতে শেয়ারহোল্ডারদের এখনো ১০ কোটি ৫ লাখ টাকার লভ্যাংশ বকেয়া রয়েছে।

এ কোম্পানিটিতে শ্রম আইন অনুযায়ি ‘ওয়াকার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড’ গঠন করা হয়নি বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষক।

এ বিষয়ে জানতে ফুরচুন সুজের মিজানুর রহমান ও সচিব নাজমুল হোসেনের সঙ্গে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে নাজমুল হোসেন ৫ ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানাবেন বললেও এরপরে আর ফোন ধরেননি।

এ নিয়ে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মূখপাত্র মো: আবুল কালাম অর্থ বাণিজ্যকে বলেন, অর্থবছর শেষে নিরীক্ষকের মতামতসহ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন কমিশনে আসে। যা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ যাচাই-বাছাই করে। এতে কোন অনিয়ম বা অসঙ্গতি পেলে, কমিশন আইন অনুযায়ি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফরচুন সুজেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

কোটি কোটি টাকার সম্পদের সত্যতা নেই :

ফরচুন সুজের ২০২২-২৩ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে ৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদ দেখায়। কিন্তু নিরীক্ষক ওই সম্পদের সত্যতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার না থাকায় নিরীক্ষক এই শঙ্কা প্রকাশ করেন। এছাড়া ৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার মজুদ পণ্য ও ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বিক্রিত পণ্যের ব্যয়ের (কস্ট অব গুড সোল্ড) সত্যতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। যে হিসাবগুলোতে ভুল তথ্য দেওয়া এবং সম্পদের অস্তিত্ব না থাকার ঝুঁকি ছিল বলে জানিয়েছিলেন নিরীক্ষক।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ফরচুন সুজের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ১৭০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এরমধ্যে ৬৯.০৭ শতাংশ মালিকানা রয়েছে শেয়ারবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ছাড়া) বিনিয়োগকারীদের হাতে। কোম্পানিটির শনিবার (০৭ মার্চ) শেয়ার দর দাঁড়িয়েছে ১৩.৯০ টাকায়।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে