ঢাকা, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

সংস্কারে ‘থ্রি-আর’ : শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা

২০২৬ আগস্ট ২৪ ০৮:১৪:২৭
সংস্কারে ‘থ্রি-আর’ : শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা

দীর্ঘদিনের মন্দা, অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভরতা কাটিয়ে শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী করতে পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক নীতিদলিলে বাজার সংস্কারে ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি একনেক সভায় অনুমোদিত এই পরিকল্পনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার লক্ষ্য, ২০৩১ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারকে দেশের মূলধন সংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে ‘রিকভারি’ ধাপে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো, কারসাজি বন্ধ এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা হবে। পরবর্তী ‘রিস্টোরেশন’ ধাপে ভালো মানের বন্ড ও সুকুকসহ নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর মাধ্যমে বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হবে। আর শেষ ধাপে ‘রিকনস্ট্রাকশন’-এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারের কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের দিকে এগোনো হবে।

নীতিদলিলে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থা অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্পদ ও দায়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতাও দেখা দিচ্ছে। বিপরীতে মূলধনবাজারে সুশাসনের ঘাটতি, নিয়মিত কারসাজি, দুর্বল তথ্য প্রকাশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।

এই পরিস্থিতি বদলাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্বাধীনতা, কারিগরি সক্ষমতা ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। কারসাজি শনাক্ত ও প্রতিরোধে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অডিট ও করপোরেট গভর্ন্যান্স আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে গ্রিন বন্ড, ব্লু বন্ড, সোশ্যাল বন্ড ও ইসলামিক সুকুকের মতো টেকসই আর্থিক পণ্য চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে সরকার।

বাজারের অস্থিরতা কমাতে মিউচুয়াল ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা ও পেনশন ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এসএমই ও স্টার্টআপগুলোর জন্য বিকল্প প্ল্যাটফর্মে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম বছরেই বাজার স্থিতিশীল করতে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সংস্কার পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এলডিসি উত্তরণের পর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।

সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল আলম। তবে তাঁর মতে, বাজারের মূল সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

আগামীর সময়কে সাইফুল আলম বলেন, ‘আমাদের শেয়ারবাজারের প্রধান সমস্যা হলো ভালো কোনো কোম্পানি এখানে আসতে চায় না। ভালো কোম্পানি আনতে নীতিগত বাধ্যবাধকতা দরকার।’ তাঁর প্রস্তাব, কোনো প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা মূলধন সংগ্রহ করতে চাইলে অন্তত ২৫ টাকা শেয়ারবাজার থেকে সংগ্রহের বিধান করা যেতে পারে। এতে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে উৎসাহিত হবে।

বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ইনসাইডার ট্রেডিং বন্ধেও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তিনি। সাইফুল আলম বলেন, সাধারণভাবে বাজার কারসাজির জন্য ব্রোকারদের দায়ী করা হলেও তালিকাভুক্ত কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাঁর দাবি, অতীতের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে লভ্যাংশ ঘোষণার আগেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। পরে আর বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তন দেখা যায় না। এ ধরনের ঘটনায় কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

বিএসইসিকে বিষয়টি একাধিকবার জানানো হলেও তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

সব মিলিয়ে সরকারের ‘থ্রি-আর’ পরিকল্পনায় বাজারের তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তবে পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন