ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

এলডিসি উত্তরণে রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে বড় সংস্কারের পরিকল্পনা

২০২৬ আগস্ট ২৫ ০৮:১৮:৩৮
এলডিসি উত্তরণে রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে বড় সংস্কারের পরিকল্পনা

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে সামনে রেখে রাজস্ব, ব্যাংকিং, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সম্পূর্ণ ডিজিটাল অ্যান্ড-টু-এন্ড অটোমেশন চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে কর ও শুল্ক নির্ধারণ থেকে শুরু করে রিটার্ন দাখিল ও অর্থ পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া কাগজবিহীন ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য রয়েছে।

২০২৯ সালকে সামনে রেখে ‘ন্যাশনাল রোডম্যাপ ফর স্মুথ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইরিভার্সিবল এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (২০২৬-২৯)’ শীর্ষক রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এতে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক অনুমোদন সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রোডম্যাপে বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া বাড়তি সময়কে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে না দেখে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য আগামী তিন বছরে অর্থনীতি, ব্যাংকিং, ব্যবসা, শিল্প, রপ্তানি ও মানবসম্পদের দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাঁচটি স্তম্ভে সংস্কারের পরিকল্পনা

রোডম্যাপের মূল ভিত্তি হিসেবে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক সক্ষমতা, বাণিজ্য ও বাজারসুবিধা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা ও শিল্প রূপান্তর, মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুশাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ

ব্যাংকিং খাতেও সংস্কারের বেশ কিছু পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কাঠামো তৈরি, নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট এবং ব্যাংকভিত্তিক সম্পদমান পর্যালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। তবে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, সেগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতাও দেখাতে হবে। আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা ও অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণেও দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।

সাত দিনে মিলবে বিভিন্ন অনুমোদন

বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ডিজিটাল লাইসেন্সিং এবং ‘ডিজিটাল কমন অ্যাপ্লিকেশন প্ল্যাটফর্ম’ চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় লাইসেন্স ও বিভিন্ন অনুমোদন সাত দিনের মধ্যে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স বাতিল এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কাস্টমস, বন্দর ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর আওতায় আনার উদ্যোগও রয়েছে।

অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান (বাবলু) বলেন, কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যবসার পরিবেশ, অর্থায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্ব

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট ও হালকা প্রকৌশল খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও সিইপিএর মতো বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাজারসুবিধা ধরে রাখার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৯ সালের মধ্যে লজিস্টিক ব্যয় ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০২৮ সালের মধ্যে এনবিআরে পূর্ণ অটোমেশন

রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এনবিআরের কর ব্যবস্থায় অ্যান্ড-টু-এন্ড অটোমেশন চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

করজাল সম্প্রসারণ, ব্যাংক ও সিডিবিএলের তথ্যের সমন্বয়, ভ্যাট পরিপালন বাড়ানো এবং কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি শিল্প আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। উৎপাদন খাতের সক্ষমতা ও কমপ্লায়েন্স বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

রোডম্যাপে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর জন্যও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি ‘গভর্নমেন্ট-প্রাইভেট সেক্টর কম্পিটিটিভনেস অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। আর সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে জাতীয় এলডিসি মনিটরিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন কমিটি একটি ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করবে।

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন