ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

নিরবে ধংসের পথে আরেক ব্যাংক, ঝুঁকিতে গ্রাহকদের আমানত

২০২৬ অক্টোবর ২৫ ০৯:০৪:১৯
নিরবে ধংসের পথে আরেক ব্যাংক, ঝুঁকিতে গ্রাহকদের আমানত

প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো আইএফআইসি ব্যাংক এখন গভীর আর্থিক সংকটে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে বিপুল প্রভিশন ঘাটতি, সুদ আয়ের তুলনায় সুদ ব্যয় অনেক বেশি হওয়া এবং বড় অঙ্কের পরিচালন ও নিট লোকসানের চিত্র। বছর শেষে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই বছর ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আগের বছরও লোকসানে থাকা ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতি ২০২৫ সালে আরও খারাপ হয়েছে।

দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এর সাবেক সভাপতি এএসএম শায়খুল ইসলাম (এফসিএমএ) বলেন, দেশের ব্যাংক খাতের অর্থকে ঋণের নামে লুটপাট করা হয়েছে, এটা সবাই জানে। এ কারনেই বেশ কিছু ব্যাংক এখন খেলাপিতে ভুগছে। কিন্তু তারপরেও সঞ্চিতি গঠন করছে না। এর মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা আড়াঁল করা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এই সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে চাচ্ছে। দেখা যাক কতটা সফল হয়।

১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করা আইএফআইসি প্রথমে যৌথ উদ্যোগের আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপ নেয়। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এই ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি এখন বড় প্রশ্নের মুখে। বিশেষ করে বিপুল অঙ্কের ঋণঝুঁকি সামাল দিতে না পারা এবং প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণে ঘাটতি ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নেতৃত্ব ও প্রভাব নিয়ে অতীতেও নানা অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনুসন্ধান ও মামলা হয়েছে। ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক দুরবস্থা এবং ঋণঝুঁকির ব্যাপ্তি অতীতের ব্যবস্থাপনা ও ঋণ বিতরণ নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে।

ব্যাংকটির বার্ষিক প্রতিবেদনের ব্যবস্থাপনা আলোচনায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিনিয়োগের বিপরীতে ২২ হাজার ১০ কোটি ৯৫ টাকা প্রভিশন বা সঞ্চিতি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সঞ্চিতি করেছে ৭৯২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি সংরক্ষণ না করায় আর্থিক বিবরণীতে সম্পদ, মুনাফা ও ইক্যুইটি অতিরঞ্জিত এবং দায় কম দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকটির বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচালন মুনাফা না থাকায় ২০২৫ সালে মুনাফা-লোকসান হিসাবে নতুন করে প্রভিশন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ঘাটতি সমন্বয় না করেই আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ব্যাংকটির আয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে সুদ আয় কমেছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা বা প্রায় ৪৫ শতাংশ। বিপরীতে আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আগের বছর এ ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৭৪১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফলে সুদ আয় ও সুদ ব্যয়ের ব্যবধান ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ সুদ থেকে আয় যা হয়েছে, তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ব্যয় হয়েছে সুদ পরিশোধে।

সুদ আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান ব্যাংকটির পরিচালন লোকসানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আগের বছর পরিচালন লোকসান ছিল প্রায় ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পরিচালন ফলাফলে বড় অবনতি হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনের ব্যবস্থাপনা আলোচনা অনুযায়ী, ঋণমানের অবনতি এবং নিট সুদ আয়ের বড় পতন এ লোকসানের প্রধান কারণ।

লোকসানের প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি মুনাফাতেও। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পৃথক আর্থিক হিসাবে নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে লোকসান ছিল প্রায় ১০২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা, আগের বছর যা ছিল ৫৩ পয়সা। একই সঙ্গে আগের বছরের প্রায় ২১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার সঞ্চিত মুনাফার উদ্বৃত্ত ২০২৫ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক প্রায় ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির পরিচালন ব্যয়ের কয়েকটি খাতেও বৃদ্ধি দেখা যায়। লোকসানের বছরে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে। ব্যাংকটির সমন্বিত হিসাবে হিসাবে, ২০২৫ সালে পরিচালকদের ফি ও সম্মানী খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৬ লাখ ১ হাজার ৮৩৩ টাকা। আগের বছর ছিল ৫০ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৪ টাকা।

নিরীক্ষকের প্রতিবেদনেও ঋণের বিপরীতে প্রভিশন নির্ধারণ এবং সুদ আয় স্বীকৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা-বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুদ আয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভুল বা জালিয়াতির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে নিরীক্ষা-সংক্রান্ত আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে। বিপুল প্রভিশন ঘাটতি ও ঋণমানের অবনতির সঙ্গে এই নিরীক্ষা-উদ্বেগ ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এসব বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হুসাইন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মনসুর মুস্তফার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দিয়েও প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন