ঢাকা, রবিবার, ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২

অবৈধভাবে উচ্চ দরে শেয়ার বিক্রি করে আত্মসাত : এবার কম দামে ছেলের নামে শেয়ার ক্রয়

২০২৫ আগস্ট ৩১ ০৭:৪৫:৩২
অবৈধভাবে উচ্চ দরে শেয়ার বিক্রি করে আত্মসাত : এবার কম দামে ছেলের নামে শেয়ার ক্রয়

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বে লিজিং এন্ড ইনভেস্টমেন্টের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আগাম জেনে উচ্চ দরে শেয়ার বিক্রি করে (ইনসাইডার ট্রেডিং) অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নেয় সাউথইষ্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির। এর মাধ্যমে সাধারন বিনিয়োগকারীদেরকে পথের ফকির বানানো হয়েছে। এ জন্য তাকে ১২ কোটি টাকা জরিমানা করে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই কারণে আলমগীর কবিরের স্ত্রী এবং বে লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক সুরাইয়া বেগমকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এবার তারাই তলানিতে নেমে আসা বে লিজিংয়ের শেয়ার ছেলের নামে কিনে আবারও কোম্পানিটিতে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে।

বিএসইসি গত বছরের ১৯ নভেম্বর ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের কারণে আলমগীর কবির এবং সুরাইয়া বেগমের পাশাপাশি তাদের জামাতা তুষার এলকে মিয়াকে ২.৫০ কোটি টাকা এবং সাউথইষ্ট ব্যাংকের মালিকানাধীন মার্চেন্ট ব্যাংক সাউথইষ্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেসকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছিল। এছাড়া বে লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং কোম্পানি সচিবকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়।

তথ্য মতে, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের পর কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়তে বা কমতে পারে। সাধারণত বেশি মুনাফা পেতে বা লোকসান কমাতে ইনসাইডার ট্রেড করা হয়। কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক, শীর্ষ কর্মকর্তাসহ তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যরা 'ইনসাইডার' হিসেবে বিবেচিত হন। আলমগীর কবির শেয়ারবাজারে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের ক্ষতিকর দিক এবং এ-সংক্রান্ত অপরাধের বিষয়টি জানতেন।

এই আলমগীর কবিররা ২০২২ সালের শুরুতে গোপন তথ্য পেয়ে বে লিজিংয়ের শেয়ার বিক্রি (ইনসাইডার ট্রেডিং) করে দেয়। ২০২২ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বে-লিজিংয়ের অন্যতম প্রধান শেয়ারহোল্ডার সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেস ১ কোটি ৩৬ লাখ শেয়ার থেকে ১ কোটিরও বেশি বিক্রি করে। এছাড়া আলমগীর কবির তাঁর ব্যক্তিগত বিও হিসাবে থাকা প্রায় ৪০ লাখ শেয়ারের পুরোটাই বিক্রি করেন।

আলমগীর কবিররা যখন শেয়ার বিক্রি করেন, ওইসময় কোম্পানিটির প্রতিটির শেয়ার দর ছিল ৪০ টাকার কাছে। যে শেয়ার এখন ৪ টাকায় নেমে এসেছে।

এই অবস্থায় এসে স্বস্তায় শেয়ার কিনে কোম্পানিটিতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে আলমগীর কবিরের পরিবার। যার ধারাবাহিকতায় আলমগীর কবিরের ছেলে রাইয়ান কবির গত ২৮ আগস্ট কোম্পানিটির ১৫ লাখ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। যা আগামি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কেনা হবে বলে জানিয়েছেন।

দেখা যায়, কোম্পানিটির ২০২১ সালে মুনাফা থেকে বড় লোকসানের আগাম তথ্য পায় আলমগীর কবিররা। ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ২০২১ সালে প্রায় ১৪ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। এর আগে ওই বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন প্রান্তিক মিলিয়ে ৯ মাসের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর। ওই ৯ মাসে কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে মুনাফার এ তথ্যই সাড়ে ১০ মাস ধরে বা ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জানতেন শেয়ারহোল্ডাররা। তবে পুরো হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর জানা যায়, শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) লোকসান হয়েছে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা।

এই লোকসানের খবর প্রকাশের আগেই আলমগীর চক্র জেনে গিয়েছিল কোম্পানির পর্ষদের আলমগীর কবিরের আত্মীয়স্বজন থাকায়। যাতে আলমগীর চক্র শেয়ার বিক্রি করে দেয় লোকসানের খবর প্রকাশের আগেই। এটা ইনসাইডার ট্রেডিং হিসেবে ছিল নিষিদ্ধ। তারপরেও বিক্রি করে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে আলমগীর চক্রকে শাস্তির আওতায় এনেছে বিএসইসি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বে লিজিংয়ের মূল উদ্যোক্তা আলমগীর কবিরের ভাই শাহজাহান কবির। স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়ার সুবাধে আলমগীর কবির অবাধে পরিচালনা পর্ষদের সভায় অংশগ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতেন। এসব কারনে তিনি কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ খবর আগেই জানতেন।

বিভিন্ন অপরাধের হোতা সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবিরের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। গত ১৪ জুলাই দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে এই আদেশ দেয় আদালত।

আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উক্ত ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগটি অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আলমগীর কবির দেশ ছেড়ে বিদেশে পলায়ন করতে পারেন মর্মে বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বিদেশ গমন আটকানো প্রয়োজন মনে করে দুদক।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে প্রথম ধসের সময় আলমগীর কবির বিএসইসির সদস্য ছিলেন। তিনি কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁকেসহ সে সময়কার অন্য সদস্যদের অপসারণ করেছিল। আলমগীর কবির সাউথইস্ট ব্যাংকের পাশাপাশি সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেসেরও চেয়ারম্যান ছিলেন কিছুদিন আগে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে