ঢাকা, বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩

মূল ব্যবসা থেকে সরে যাচ্ছে ইউসিবি

লোকসান ৬ হাজার কোটি : খাতায় কৃত্রিম মুনাফা

২০২৬ আগস্ট ১৯ ০৮:৪৭:৩৩
লোকসান ৬ হাজার কোটি : খাতায় কৃত্রিম মুনাফা

বেসরকারি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির আর্থিক প্রতিবেদনে ঘোষিত মুনাফার আড়ালে বড় ধরনের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকটির মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম—ঋণ ও আমানতভিত্তিক আয়—উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ ও অন্যান্য উৎসের আয় দিয়ে মুনাফা ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) গঠন না করায় প্রকৃত লোকসান আড়াল হয়েছে। নিরীক্ষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন করা হলে ব্যাংকটির লোকসান প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাত। অথচ আর্থিক বিবরণীতে মুনাফার চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।

এমন আর্থিক অবস্থার মধ্যেই রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৭৭৫ কোটি ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯০ টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে ইউসিবি। এ লক্ষ্যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৭৭ কোটি ৫১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৪৯টি সাধারণ শেয়ার ইস্যু করা হবে। আগামী ২৩ আগস্ট থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়ে চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কারণে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকটির শেয়ারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে ইউসিবির নিট সুদ আয় ছিল ২ হাজার ৮৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৯৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে নিট সুদ আয়ে পতন ১ হাজার ৯৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা বা ৫৩ শতাংশ, যা মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

এই ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংকটি ঋণ কার্যক্রমের বদলে বিনিয়োগ আয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড, প্রাইজ বন্ড ও বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালে যেখানে মোট বিনিয়োগ ছিল ৮ হাজার ৭৮৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮৭১ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে ৬ হাজার ৮৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা বা ৬৯ শতাংশ।

এর ফলে বিনিয়োগ আয়ও বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকটির আয় ছিল ৭৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৭৪৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ১০১ শতাংশ।

এ ছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটি কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ থেকে আয় করেছে ৭৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং অন্যান্য পরিচালন খাত থেকে আয় করেছে ২৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এসব আয়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকটি মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ৬০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ৫ শতাংশ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ ও অন্যান্য পরিচালন আয় বাদ দিলে ব্যাংকটি কার্যত লোকসানে পড়ত। কারণ ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ছিল ৯৮৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা, অথচ একই বছরে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে বেতনাদিবাবদই ব্যয় হয়েছে ৯৬৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ বিবেচনায় মূল ব্যবসা দিয়ে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনাদিবাবদ ব্যয়ের সমান আয় হয়েছে।

অথচ ব্যাংকটির এর বাহিরেও অনেক ব্যয় রয়েছে। যাতে ২০২৫ সালে বেতনাদিসহ ব্যাংকটির মোট পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি ব্যয় যোগ হয়েছে আরও ৯৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইউসিবি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে প্রকাশিত হিসাবের বড় ধরনের অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকটির ৯ হাজার ৫৭৬ কোটি ২৩ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা সঞ্চিতি গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ব্যাংকটি গঠন করেছে মাত্র ২ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ফলে এ খাতে সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৫৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সম্পদের বিপরীতেও ৪৩৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ও লিজিং কোম্পানিতে এফডিআরের বিপরীতে ১৫৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। সব মিলিয়ে সঞ্চিতির ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৭৫০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এই ঘাটতির কারণে ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণীতে সম্পদ, মুনাফা ও ইক্যুইটি প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বেশি এবং দায় কম দেখানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি গঠন করা হলে মুনাফার পরিবর্তে ব্যাংকটির ৫ হাজার ৭২৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা শেয়ারপ্রতি ৩৬.৯৪ টাকা লোকসান দেখাতে হতো। নিরীক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া ছাড় থাকলেও এ ধরনের হিসাব উপস্থাপন আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারেন।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সাল শেষে ১ হাজার ৫৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের ইউসিবিতে ৪ হাজার ২০৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকার নিট সম্পদ ছিল। ব্যাংকটি থেকে গত ৩১ ডিসেম্বর প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি ১ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ৬৮ হাজার ৩৯৪ কোটি ১৫ লাখ টাকার আমানত রয়েছে। এরমধ্যে ৪০ হাজার ৬৪৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন