ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩

অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস, তবে সংকট কাটেনি: এমসিসিআই

২০২৬ আগস্ট ২৫ ১৯:০৪:৩৮
অর্থনীতিতে স্বস্তির আভাস, তবে সংকট কাটেনি: এমসিসিআই

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, রপ্তানিতে গতি ফেরানো এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানোকে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাপ এখনো কাটেনি। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে আছে।

এমসিসিআইয়ের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও তা টেকসই করতে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখায় গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি এখনো কম বলে মনে করছে এমসিসিআই।

মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি

বৈদেশিক খাতকে অর্থনীতির তুলনামূলক স্বস্তির জায়গা হিসেবে উল্লেখ করেছে এমসিসিআই। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৯৩৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মে শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

তবে রপ্তানি খাতে একই ধরনের গতি দেখা যায়নি। জুনে রপ্তানি আয় বেড়ে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থবছর শেষে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৪৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।

বেসরকারি ঋণে স্থবিরতা

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতিকে তুলে ধরেছে এমসিসিআই। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

এর বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয়ে চাপ

রাজস্ব আদায় ও সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দুর্বলতা রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। তবে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার তুলনায় আদায় কম হয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বা ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।

একই সময়ে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে নেমেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাণিজ্যঘাটতি বাড়লেও ব্যালান্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টে ৬ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত হয়েছে। তবে একই সময়ে বাণিজ্যঘাটতি ৩৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে ২৭ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১৫ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বৈদেশিক খাতে সামগ্রিক ভারসাম্য কিছুটা উন্নত হলেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো দুর্বলতা রয়েছে।

সব মিলিয়ে এমসিসিআই বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও পুনরুদ্ধারকে টেকসই ও গতিশীল করতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং রপ্তানি ও এফডিআই বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত মোকাবিলা করতে হবে।

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন