ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এলএনজি সরবরাহে নতুন ঝুঁকি, বাড়ছে বাংলাদেশের উদ্বেগ

২০২৬ অক্টোবর ০৮ ০৮:৪৯:০৬
এলএনজি সরবরাহে নতুন ঝুঁকি, বাড়ছে বাংলাদেশের উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আবারও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইউরোপের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হয়ে ওঠা কাতারের এলএনজি রপ্তানিও এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক গ্যাসের বাজারে। এশিয়ায় এলএনজির দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে শীতের আগে ইউরোপের গ্যাস মজুদ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপে চাহিদা বেড়ে গেলে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এলএনজি সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশও।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কাতারের এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না কাতার। পরিস্থিতির মধ্যে দেশটি মাত্র ৯৮টি এলএনজি জাহাজের চালান পাঠাতে পেরেছে। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৩৪টি।

অর্থাৎ এক বছরে চালান কমেছে ৫৩৬টি। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন এলএনজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির পরিমাণ গত বছর বিশ্বে সরবরাহ করা মোট এলএনজির প্রায় ৯ শতাংশের সমান।

এশিয়ায় এলএনজির দাম বেড়েছে ১৪০%

সরবরাহ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার গ্যাসের বাজারে। বর্তমানে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) প্রায় ২৫ ডলারে উঠেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এ দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেশি। তবে ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। ওই সময় এলএনজির দাম সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ ডলারে উঠেছিল।

ইউরোপের গ্যাস মজুদেও উদ্বেগ

এলএনজি সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি ইউরোপের গ্যাস মজুদ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো প্রায় ৭২ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে, যা বছরের এই সময়ের হিসাবে সর্বনিম্ন।

২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে ইউরোপের গড় গ্যাস মজুদ ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে মজুদের পরিমাণ আরও কম—মাত্র ৫৭ শতাংশ।

শীতে ইউরোপ-এশিয়ার প্রতিযোগিতা বাড়ার আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নভেম্বরে ইউরোপে অপ্রত্যাশিতভাবে তীব্র শীত শুরু হলে গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তখন ইউরোপের দেশগুলো এলএনজি কিনতে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামবে।

এ পরিস্থিতিতে এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শীত দীর্ঘ হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে এলএনজি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। ফলে আমদানিনির্ভর এশীয় দেশগুলোকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বাড়ছে ঝুঁকি

এলএনজি সরবরাহের এই সংকট বাংলাদেশের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দেশের গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম আরও বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত এলএনজি সংগ্রহ করতে না পারলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২০২৭ সালেও বাড়তি দামের আশঙ্কা

কাতারের এলএনজি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী শীতের আগে ইউরোপের গ্যাস মজুদ পূরণ করতে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি প্রয়োজন হতে পারে।

এর ফলে ২০২৭ সালজুড়েই আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের মজুদ পুনর্গঠন এবং শীতকালীন চাহিদা মেটাতে বাড়তি এলএনজি কেনার প্রয়োজন হলে এশিয়ার আমদানিকারক দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বর্তমান সংকট ও উচ্চমূল্যের চাপ ধীরে ধীরে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। :

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন