ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই মুনাফার

ফাইন ফুডসের মুনাফার সত্যতা নিয়ে শঙ্কা

২০২৬ অক্টোবর ০৮ ১০:১৩:০১
ফাইন ফুডসের মুনাফার সত্যতা নিয়ে শঙ্কা

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফাইন ফুডসের মুনাফার সত্যতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। কোম্পানিটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ১১ দশমিক ৮১ টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। বিপরীতে একই সময়ে শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৯০ টাকা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে মুনাফা প্রায় ১২ টাকা দেখালেও ব্যবসা থেকে নগদ অর্থ এসেছে খুবই কম। এই সত্য লুকাতে শুধুমাত্র সাধারন শেয়ারহোল্ডারদের তুলনায় নামমাত্র লভ্যাংশ নেবে উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা।

কারসাজির কোম্পানিটির শেয়ারদর বর্তমানে ৪৭১ টাকা ৪০ পয়সায় রয়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ফাইন ফুডস। আর উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা নেবে ৫ শতাংশ। কারণ কোম্পানিটির সবাইকে ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। এ কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে শেয়ারপ্রতি নগদ অর্থ এসেছে মাত্র ১ টাকা ৯০ পয়সা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফাইন ফুডসের শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে ১১ দশমিক ৮১ টাকা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ২০ টাকা। আগের অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ৪ দশমিক ১৮ টাকা। সে বছর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ১৪ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৪ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে মুনাফা ও নগদ প্রবাহের এমন বড় ব্যবধানকে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে কোম্পানিটির আর্থিক হিসাবের বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা নিয়ে নিরীক্ষক আপত্তি জানিয়ে আসছেন। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবেও বেশ কিছু লেনদেন ও সম্পদের অস্তিত্ব এবং মূল্য নিয়ে নিরীক্ষক পর্যাপ্ত প্রমাণ পাননি।

আরও পড়ুন.....

ফাইন ফুডসের শেয়ার কারসাজিতে জড়িতদের ১.৯৭ কোটি টাকা জারিমানা

নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফাইন ফুডস ১১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আয়, বাকিতে বিক্রয় বাবদ ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পাওনা, কাঁচামাল ক্রয়ে ৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ফিঙ্গারলিঙ্ক ক্রয়ে ২ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। তবে এসব লেনদেনের প্রায় সবই নগদে করা হয়েছে বলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের অভাবে এসব লেনদেনের সত্যতা যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। এমনকি এসব তথ্যের মধ্যে মিথ্যা তথ্য থাকার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোম্পানিটির মুনাফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে মজুদ পণ্য নিয়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মজুদ পণ্য দেখায় ফাইন ফুডস। কিন্তু এর সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষককে পুরোপুরি সহযোগিতা করতে পারেনি। সরেজমিন পরিদর্শন এবং বিকল্প নিরীক্ষা প্রক্রিয়া অনুসরণ করেও ওই সম্পদের অস্তিত্ব যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। ফলে মজুদ পণ্য এবং বিক্রিত পণ্যের ব্যয় বা কস্ট অব গুডস সোল্ড হিসাবে ভুল বা মিথ্যা তথ্য থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কস্ট অব গুডস সোল্ড কম দেখানো হলে কোম্পানির নিট মুনাফা বেশি দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ পণ্যের প্রকৃত ব্যয় কম দেখিয়ে মুনাফা কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছে কি না সে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন বিষয়কে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

এমন ধারাবাহিক আপত্তির মধ্যেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফাইন ফুডসের শেয়ারপ্রতি মুনাফা আগের বছরের ৪ দশমিক ১৮ টাকা থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৮১ টাকায় উঠেছে। একই সঙ্গে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত ব্যবসায়িক আয় কতটা এবং হিসাবের মাধ্যমে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া শেয়ারের দর ধরে রাখতে উচ্চ মুনাফা ও বড় লভ্যাংশ ঘোষণার প্রবণতা থাকলে সেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে পরিচালন নগদ প্রবাহ যেখানে শেয়ারপ্রতি মাত্র ১ টাকা ৯০ পয়সা সেখানে শেয়ারপ্রতি ১১ টাকা ৮১ পয়সা মুনাফা এবং ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের হিসাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

ফাইন ফুডসের ঘোষিত লভ্যাংশসহ অন্যান্য আলোচ্য বিষয় শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য আগামী ২৬ ডিসেম্বর বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএম অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য শেয়ারহোল্ডার নির্ধারণে আগামী ১২ নভেম্বর রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন