ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

গোলকিপারদের ব্যালন ডি’অর জয়ের অপেক্ষা ৬৩ বছরের

২০২৬ অক্টোবর ২০ ১৯:৩৬:০২
গোলকিপারদের ব্যালন ডি’অর জয়ের অপেক্ষা ৬৩ বছরের

খেলাধুলা ডেস্ক : ফুটবলে গোল করলেই নায়ক হওয়া যায়। কিন্তু প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোল ঠেকিয়েও অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যান গোলকিপাররা। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যালন ডি’অরেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৬৩ সালে রাশিয়ার কিংবদন্তি লেভ ইয়াশিনের পর আর কোনো গোলকিপার জিততে পারেননি ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার। অথচ একাধিক গোলকিপার নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে পুরস্কারটির দাবিদার হয়ে উঠেছিলেন।

২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ব্রাজিলের জয়ের স্মৃতি অনেকেরই মনে আছে। তবে সেই ম্যাচে জার্মান গোলকিপার অলিভার কানের একটি ভুলও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে রয়ে গেছে। রিভালদোর শট ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় ফিরতি বলে গোল করেন রোনালদো। সেই ভুলের কারণে ফাইনালে কানের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়। অথচ পুরো বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলে সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জিতেছিলেন তিনি। বিশ্বকাপে এই পুরস্কারজয়ী একমাত্র গোলকিপারও কান।

২০০২ সালের ব্যালন ডি’অরেও তৃতীয় হয়েছিলেন জার্মানির এই কিংবদন্তি। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালের ফল ভিন্ন হলে তাঁর পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। তবে সেটি নিছক অনুমান। বাস্তবে ইয়াশিনের পর আর কোনো গোলকিপার ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি।

গোলকিপারদের জন্য সমস্যাটি শুধু পুরস্কারের ভোটে পিছিয়ে পড়া নয়। পুরো ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর একটি ভুলেই তাঁদের অর্জন প্রশ্নের মুখে পড়ে। অন্যদিকে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা বেশির ভাগ সময় নিষ্প্রভ থেকেও শেষ মুহূর্তে একটি গোল করে ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠতে পারেন। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, গোলকিপারদের অবদান কেন ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত পুরস্কারে যথাযথ স্বীকৃতি পায় না?

১৯৬৩ সালে ইয়াশিনের ঐতিহাসিক জয়ের পর কয়েকজন গোলকিপার পুরস্কারটির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। ১৯৭৩ সালে ইতালির দিনো জফ দ্বিতীয় হয়েছিলেন। জুভেন্টাসের হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ইতালির জাতীয় দলের পোস্টে টানা ১ হাজার ৪২ মিনিট গোল হজম না করার কৃতিত্বও ছিল তাঁর। ২০০৬ সালে ইতালির বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হন জিয়ানলুইজি বুফন। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ের পর একই অবস্থানে ছিলেন ম্যানুয়েল নয়্যার।

তাঁদের প্রত্যেকের খেলার ধরন ছিল আলাদা। জফ ছিলেন ধারাবাহিকতা ও রক্ষণাত্মক দক্ষতার প্রতীক। কান দেখিয়েছেন, বড় টুর্নামেন্টে একজন গোলকিপার কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। বুফন ছিলেন অসাধারণ শট ঠেকানোর দক্ষতার জন্য পরিচিত। আর নয়্যার প্রচলিত গোলকিপিংয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে বক্সের বাইরে এসে বল নিয়ন্ত্রণ, পাস দেওয়া এবং সুইপারের ভূমিকায় নতুন মাত্রা যোগ করেন। তারপরও ব্যালন ডি’অর জেতা হয়নি তাঁদের কারও।

এর একটি বড় কারণ, ফুটবলে আক্রমণভাগের অবদান পরিমাপ করা তুলনামূলক সহজ। গোল ও অ্যাসিস্টের পরিসংখ্যানেই একজন ফরোয়ার্ডের কার্যকারিতা অনেকটা বোঝা যায়। কিন্তু গোলকিপারের অবদান শুধু সেভের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। কখন এগিয়ে আসতে হবে, কীভাবে বিপদ সামলাতে হবে, রক্ষণভাগের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে—এসব সিদ্ধান্তও ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ধরা যাক, প্রতিপক্ষের একটি থ্রু পাসের বিপদ আগেই বুঝতে পেরে গোলকিপার পোস্ট ছেড়ে এগিয়ে এসে বল বিপদমুক্ত করলেন। এতে কোনো সেভের হিসাব যুক্ত হলো না, তৈরি হলো না দর্শকের জন্য আকর্ষণীয় কোনো দৃশ্যও। কিন্তু তাঁর সঠিক সিদ্ধান্তে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট হতে পারে। গোল ও অ্যাসিস্টের মতো এসব অবদান সহজে পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

আধুনিক ফুটবলে প্রত্যাশিত গোলের মতো পরিসংখ্যান আক্রমণভাগের সুযোগের মান বুঝতে সাহায্য করে। শট নেওয়ার পর গোল হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেও গোলকিপারের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা যায়। তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে একজন গোলকিপারের সব অবদান তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাঁর অবস্থান নির্বাচন, বল বিতরণ, রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গা নিয়ন্ত্রণ এবং বিপদ আগেভাগে বুঝতে পারার দক্ষতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

গোলকিপারের প্রভাব শুধু গোল ঠেকানোর মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। নটিংহাম ফরেস্টের কোচ ব্রায়ান ক্লফ মনে করতেন, একজন ভালো গোলকিপার একটি মৌসুমে দলকে ১৫ থেকে ২০ পয়েন্ট এনে দিতে পারেন। পিটার শিলটনের মতো গোলকিপারের উপস্থিতি দলের অন্য খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়াত। রক্ষণভাগের খেলোয়াড়েরা জানতেন, তাঁদের পেছনে নির্ভরযোগ্য একজন আছেন। ফলে তাঁরা আরও আগ্রাসীভাবে খেলতে পারতেন। আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরাও বিশ্বাস পেতেন, একটি গোলই ম্যাচ জেতানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

দল যখন প্রতিপক্ষের চাপে থাকে, তখন গোলকিপারের একটি দুর্দান্ত সেভ পুরো দলকে নতুন করে উজ্জীবিত করতে পারে। আবার একের পর এক সুযোগ নষ্ট হলে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরাও মানসিক চাপে পড়ে যান। এসব প্রভাবের পরিসংখ্যান তৈরি করা কঠিন হলেও ম্যাচের ফলাফলে এর গুরুত্ব কম নয়।

ফুটবলে গোলের দৃশ্য সহজেই দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল পরদিন সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়। কিন্তু সেই ম্যাচে গোলকিপারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভের কথা অনেক সময় আলোচনাতেই আসে না। ব্যক্তিগত পুরস্কারের ভোটেও দৃশ্যমান অবদানের এই সুবিধা আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের এগিয়ে রাখতে পারে।

এই বাস্তবতার কারণে গোলকিপারদের জন্য ব্যালন ডি’অর জয়ের পথ কঠিন হয়ে আছে। তাঁদের পারফরম্যান্সের মূল্যায়নে শুধু ক্লিন শিট বা গোলশূন্য ম্যাচের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। কতগুলো সম্ভাব্য গোল ঠেকিয়েছেন, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং দলের খেলার ধরনে কতটা প্রভাব রেখেছেন—এসব বিষয়ও গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

২০১৯ সাল থেকে গোলকিপারদের জন্য চালু হয়েছে ইয়াশিন ট্রফি। এটি তাঁদের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি দিলেও ব্যালন ডি’অরের সমতুল্য নয়। ১৯৬৩ সালে ইয়াশিনের ঐতিহাসিক জয়ের পর ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কান, জফ, বুফন ও নয়্যারের মতো কিংবদন্তিরা কাছাকাছি পৌঁছালেও সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারেননি।

গোলকিপারদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়নের জন্য ফুটবলবিশ্বকে তাই গোল ও অ্যাসিস্টের বাইরেও তাকাতে হবে। কারণ, একজন ফরোয়ার্ডের গোল যেমন ম্যাচ জেতাতে পারে, তেমনি গোলকিপারের একটি সেভ কিংবা সঠিক সময়ে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তও দলের জয় নিশ্চিত করতে পারে।

পাঠকের মতামত:

খেলাধূলা এর সর্বশেষ খবর

খেলাধূলা - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন