ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

১২৪ কোটি টাকা শাস্তি পাচ্ছে শেয়ারবাজারের ১৪ ব্যাংক

২০২৬ জুন ২৩ ০৮:৩৫:৩১
১২৪ কোটি টাকা শাস্তি পাচ্ছে শেয়ারবাজারের ১৪ ব্যাংক

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ১০ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫ সালের ব্যবসায় মুনাফা সত্ত্বেও কোন লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। এর মাধ্যমে পুরো মুনাফা রিটেইন আর্নিংসে রাখা হবে। যে কারনে ব্যাংকগুলোকে রেখে দেওয়া ওই মুনাফার উপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে ৫১ কোটি টাকার বেশি কর দিতে হবে। এছাড়া নগদের চেয়ে বেশি বোনাস শেয়ার দেওয়ার সিদ্ধান্তে ৩ ব্যাংককে ৬০ কোটি টাকা ও শুধুমাত্র বোনাস শেয়ার ঘোষণার কারনে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককে প্রায় ১৩ কোটি টাকার একই ধরনের শাস্তি পেতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এসব বিষয় জানা গেছে।

জানা গেছে, এ বছর মুনাফা সত্ত্বেও লভ্যাংশ দেবে না - মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, ইউসিবি, রূপালি ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংক।

সম্প্রতি এই ১০ ব্যাংকের পর্ষদ মুনাফা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বাঁধায় শেয়ারহোল্ডারদের কোন লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরের আয়কর পরিপত্র অনুযায়ি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে মুনাফার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ আকারে শেয়ারহোল্ডারদেরকে দিতে হবে। যদি ৩০ শতাংশের কম দেওয়া হয়, তাহলে রিটেইন আর্নিংসে স্থানান্তর করা পুরো অংশ বা কোম্পানিতে রেখে দেওয়া পুরোটার উপরে ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে।

ওই ১০ ব্যাংকের ২০২৫ সালে ৫১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার নিট মুনাফা হয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ কোন লভ্যাংশ ঘোষনা করেনি। পুরোটাই রিটেইন আর্নিংসে রাখা হবে।

মুনাফার পুরোটা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকগুলোকে ৫১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার উপরে ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত ৫১ কোটি ২০ লাখ টাকার অতিরিক্ত কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের নিজস্ব মুনাফার উপর ১০ শতাংশ হারে এই অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

আরও পড়ুন.....

শেয়ারবাজারের ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে ৬৭ শতাংশ

অন্যদিকে পূবালি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদ নগদের চেয়ে বেশি বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে পূবালি ব্যাংকের পর্ষদ ১০% হিসাবে ১৩০ কোটি ১৪ লাখ টাকার নগদ ও ২০% হিসেবে ২৬০ কোটি ২৯ লাখ টাকার বোনাস, উত্তরা ব্যাংকের পর্ষদ ৫% হিসেবে ৪৮ কোটি ৫১ লাখ টাকার নগদ লভ্যাংশ ও ২৫% হিসেবে ২৪২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আর সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদ ৩% হিসেবে ৪০ কোটি ১২ লাখ টাকার নগদ লভ্যাংশ ও ৭% হিসেবে ৯৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার বোনাস শেয়ার দেবে।

এছাড়া মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি ৩.১৪ টাকা করে ৩৩৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকার নিট মুনাফা হলেও ব্যাংকটির পর্ষদ শেয়ারহোল্ডারদের কোন নগদ লভ্যাংশ দেবে না। তারা ১২ শতাংশ বোনাস শেয়ার হিসাবে ১২৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দিয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়াবে। মুনাফার বাকি ২০৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ৬২ শতাংশ রিটেইন আর্নিংস রাখা হবে।

তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ি, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কোনো অর্থবছরে নগদ লভ্যাংশের বেশি বোনাস শেয়ার দিতে পারবে না। অর্থাৎ বোনাস লভ্যাংশ সর্বোচ্চ নগদের সমান হতে পারবে। যদি কোনো কোম্পানি বোনাস শেয়ার বেশি দেয়, তাহলে ওই বোনাস শেয়ারের উপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।

এ হিসাবে পূবালি ব্যাংককে ২৬০ কোটি ২৯ লাখ টাকার বোনাস শেয়ারের উপর ১০% হারে ২৬ কোটি ৩ লাখ টাকা, উত্তরা ব্যাংককে ২৪২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বোনাস শেয়ারের উপরে ১০ শতাংশ হিসাবে ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৯৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার উপরে ১০ শতাংশ হিসাবে ৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককে ১২৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বোনাস শেয়ারের উপরে ১০% হারে ১২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার অতিরিক্ত কর দিতে হবে। অর্থাৎ এই ৪ ব্যাংককে বোনাস শেয়ারের কারনে ৭২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা শাস্তি পেতে হবে।

দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) এর সাবেক সভাপতি এএসএম শায়খুল ইসলাম (এফসিএমএ) বলেন, অনেক ব্যাংক প্রভিশনিং ঘাটতি রেখে মুনাফা দেখিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওইসব ব্যাংক মুনাফায় নেই। যাতে লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। কিন্তু মুনাফা যেহেতু দেখিয়েছে এবং লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেহেতু শাস্তির আওতায় আসতে হবে।

নিম্নে লভ্যাংশ না দেওয়া ব্যাংকগুলোর ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ও নিট মুনাফার তথ্য তুলে ধরা হল-

ব্যাংকের নাম

ইপিএস

(টাকা)

মুনাফা

(কোটি টাকা)

মার্কেন্টাইল ব্যাংক

১.১০

১২১.৭২

ইসলামী ব্যাংক

০.৮৫

১৩৬.৮৫

আল-আরাফাহ ব্যাংক

০.৭৪

৮৫.২৩

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

০.৭২

৮০.৩৪

ওয়ান ব্যাংক

০.২৮

২৯.৮৪

এনআরবি ব্যাংক

০.২০

১৩.৮১

এনআরবিসি ব্যাংক

০.১৬

১৩.২৬

ইউসিবি

০.১৫

২৩.২৬

রূপালি ব্যাংক

০.১৪

৬.৮৩

এসবিএসি ব্যাংক

০.০১

০.৮২

মোট- ১০টি ব্যাংক

.

৫১১.৯৬ কোটি টাকা

লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের। ইপিএসে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও পরিশোধিত মূলধনে এগিয়ে থাকায় ব্যাংকটি নিট মুনাফায় এগিয়ে। এ ব্যাংকটির ২০২৫ সালে শেয়ারপ্রতি ০.৮৫ টাকা করে নিট ১৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা মুনাফা হয়েছে। তবে কোন লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যাংকটিকে ওই মুনাফার উপরে ১০ শতাংশ হারে ১৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকার অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১২ কোটি ১৭ লাখ টাকার শাস্তির আওতায় আসবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। আর আল-আরাফাহ ব্যাংককে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা দিতে হবে।

এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংককে ৮ কোটি ৩ লাখ টাকা, ওয়ান ব্যাংককে ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, এনআরবি ব্যাংককে ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, এনআরবিসি ব্যাংককে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, ইউসিবিকে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, রূপালি ব্যাংককে ৬৮ লাখ টাকা ও এসবিএসি ব্যাংককে ৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

এসব বিষয়ে জানতে উত্তরা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সচিবদেরকে ব্যক্তিগত ফোনে কল করলেও রিসিভ করেননি। আর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিম রিসিভ করলেও তিনি বলেন, মুনাফা সত্ত্বে লভ্যাংশ না দিলে অতিরিক্ত আয়করের শাস্তির বিধান আছে, তবে এ নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন