ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতারণার সুযোগ বাড়াচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা

২০২৬ অক্টোবর ১২ ১৭:৩২:০৬
প্রতারণার সুযোগ বাড়াচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা

অর্থ বাণিজ্য প্রতিবেদক : দেশের শেয়ারবাজারে এখনো শক্তিশালী ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের আকার ছোট, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও সীমিত। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং বাজারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এই দুর্বলতার সুযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় প্রতারক ও কারসাজিকারীরা বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম এসব কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, প্রতারণা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সোমবার (১২ অক্টোবর) ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টর উইক ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত বিনিয়োগ ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে না। দেশের অধিকাংশ আর্থিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের আকার ছোট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও সীমিত। ফলে শেয়ারবাজারে শক্তিশালী ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। অথচ বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা এখনো অটুট। দুর্বল ব্যাংকগুলোর কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতেও ভালো ব্যাংকগুলো প্রবৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে। শেয়ারবাজারেও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

ইতিবাচক খবর প্রচারেও পিছিয়ে বাজার

শেয়ারবাজারের আরেকটি দুর্বলতা হলো, ভালো উদ্যোগ ও ইতিবাচক খবর যথাযথভাবে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরতে না পারা। মমিনুল ইসলাম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে গত ১৫ দিনের সংবাদকে ইতিবাচক, নিরপেক্ষ ও নেতিবাচক—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করলে নেতিবাচক খবরের সংখ্যা অনেক বেশি দেখা যেতে পারে।

তাঁর মতে, বাজারের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে প্রচার করতে না পারলে নেতিবাচক খবরই বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব ও বাজার সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণার ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও নেতিবাচক খবরের প্রভাব বেশি থাকে।

তিনি বলেন, শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ ও প্রচার কার্যক্রমের বাজেটও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ভালো উদ্যোগগুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সুযোগে কারসাজিকারীরা নিজেদের বক্তব্য ও প্রচারণা সহজে ছড়িয়ে দিতে পারছে।

রাতারাতি দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য ও প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্রস্তাব শেয়ারবাজারের আস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন ডিএসই চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি স্টক এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে নিজেদের নিবন্ধিত আর্থিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ কারিগরি বিশ্লেষণের নামে এমন তথ্য ছড়াচ্ছেন, যার সঙ্গে বাজারের মৌলভিত্তির সম্পর্ক নেই। এসব প্রচারণার পেছনে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থও থাকতে পারে।

মমিনুল ইসলাম বলেন, এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিশ্চিতভাবে দুই লাখ টাকা পাওয়া যাবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দ্রুত আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক চক্র।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণা ছিল। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে এখন এসব প্রতারণার পরিধি বেড়েছে। এতে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থাও হারাচ্ছে।

শুধু সচেতনতা নয় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন

ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় শুধু নিয়মকানুন তৈরি বা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন মমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের কাছে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ডিএসইর নজরদারি ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএসইসির সঙ্গে সমন্বয় করে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়েও কাজ চলছে। তবে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কার্যকারিতা আরও বাড়াতে হবে।

মমিনুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের প্রতিটি বিনিয়োগ পণ্য ও প্রকল্প সম্পর্কে সঠিক, সময়োপযোগী এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্য সব বিনিয়োগকারীর কাছে সমানভাবে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি থাকলে ভুয়া তথ্য ও প্রতারণামূলক প্রচারণা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ পায়।

শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আশা

দেশের অর্থনীতির জন্য সুস্থ, শক্তিশালী ও কার্যকর শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান ডিএসই চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের শেয়ারবাজার উন্নয়নে অঙ্গীকার রয়েছে। বিএসইসির বর্তমান নেতৃত্বের কার্যক্রমেও তিনি আশাবাদ দেখছেন।

তাঁর মতে, শেয়ারবাজারের প্রতি নেতিবাচক ধারণা দূর করতে হলে প্রতারণা মোকাবিলা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক উদ্যোগের কার্যকর প্রচার—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন