ঢাকা, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

কমছে জাপানের একক আধিপত্য

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০২ ০৮:২৮:২৯
কমছে জাপানের একক আধিপত্য

দেশের মেট্রোরেল অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে জাপানের একক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল বাংলাদেশের। ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ও কারিগরি সহায়তায় বাস্তবায়িত হওয়ায় পরবর্তী মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোতেও অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় সংস্থাটি। এরই ধারাবাহিকতায় আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে জাইকার সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তি হয়েছে।

তবে এসব প্রকল্পের নির্মাণব্যয় নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জাইকার ঋণের সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় এককভাবে জাপানের অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে সরকার।

এ কারণে মেট্রোরেল খাতে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), দক্ষিণ কোরিয়া, বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও নতুন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সন্ধানেও কাজ চলছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বাস্তবায়নাধীন ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দ্বিগুণের বেশি

সম্প্রতি মেট্রোরেল নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের মেট্রোরেল নির্মাণব্যয়ের তুলনা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে বলা হয়, ভারতের বেঙ্গালুরুতে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার এবং চেন্নাইয়ে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার। বিপরীতে বাংলাদেশে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলের প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।

এত বেশি ব্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।

বৈঠকের সভাপতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণে যে ব্যয় হচ্ছে, তা অন্যান্য দেশের তুলনায় কতটা যৌক্তিক এবং কাজের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চলমান প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন প্যাকেজে যে ইঞ্জিনিয়ারিং এস্টিমেট করা হয়েছে, তা ডিপিপিতে উল্লেখিত দরের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে আন্তর্জাতিক মানের প্রাইস কনসালট্যান্ট নিয়োগ দিয়ে ব্যয় যাচাই করা প্রয়োজন।

দুটি বড় প্রকল্পে জাইকার অর্থায়ন

সূত্র জানায়, এমআরটি লাইন-১ দুটি রুটে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর একটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত, যা পুরোপুরি পাতালপথে নির্মাণ করা হবে। অন্যটি পূর্বাচল রুট—নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত, যা উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণের পরিমাণ ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটির উচ্চ প্রাক্কলিত ব্যয় নিয়ে ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে।

এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দান রুটে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ রয়েছে ৬৮ হাজার ৯১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিকল্প উৎসে ঝুঁকছে সরকার

জাইকার বাইরে এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত সাড়ে ১৭ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। উড়াল ও পাতাল—দুই পদ্ধতিতেই এ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পের আওতায় গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া এআইআইবিও প্রকল্পটিতে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৪-এর আওতায় কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত ৯ দশমিক ৯ মাইল মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ইডিসিএফ ২১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ঋণ দেবে।

সুদ বাড়িয়েছে জাইকা

দীর্ঘদিন ধরে জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে তুলনামূলক কম সুদের ঋণ দিয়ে আসছিল। ২০১৫ সাল থেকে জাইকার ঋণের সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। তবে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে সংস্থাটির ঋণের সুদের হার বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

শুধু মূল ঋণ নয়, পরামর্শক সেবা খাতের ঋণের সুদের হারও বাড়ানো হয়েছে। আগে এ খাতে সুদের হার ছিল শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে বর্তমানে ১ শতাংশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, শুরু থেকেই বাংলাদেশ জাইকার সুদের হার বৃদ্ধির বিরোধিতা করে আসছে। এ বিষয়ে জাইকার কাছে একাধিকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে সেখান থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

জাইকার ঋণের সুদ বৃদ্ধি এবং মেট্রোরেল প্রকল্পের উচ্চ নির্মাণব্যয়—দুই বিষয়ই এখন সরকারের সামনে নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মেট্রোরেল খাতে জাপানের একক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা আরও বাড়ছে।

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন