ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

তারল্য ঘাটতি ১,৬৮৮ কোটি টাকা

অস্তিত্ব সংকটে ফনিক্স ফাইন্যান্স

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০১ ০৮:১০:৫০
অস্তিত্ব সংকটে ফনিক্স ফাইন্যান্স

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া বা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। বিপুল লোকসান, ঋণাত্মক নিট সম্পদ, বড় অঙ্কের তারল্য ঘাটতি এবং মূলধন পর্যাপ্ততায় ভয়াবহ সংকট—সব মিলিয়ে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে।

কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করে এসব বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার মাহমুদ হোসাইন।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফনিক্স ফাইন্যান্সের নিট লোকসান হয়েছে ৩৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে লোকসানের পরিমাণ ছিল আরও বেশি—৮০৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ধারাবাহিক লোকসানের প্রভাবে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানিটির নিট সম্পদ ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

তারল্য ঘাটতি ১,৬৮৮ কোটি টাকা

কোম্পানিটি ভবিষ্যতে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে কি না, তা যাচাই করতে নিরীক্ষক সম্পদ ও দায়ের মেয়াদভিত্তিক কাঠামো পর্যালোচনা করেছেন। এতে দেখা গেছে, ভবিষ্যতে কোম্পানির তারল্য অবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির নিট তারল্য ঘাটতি পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৪৬ টাকা। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ে দায় পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ অর্থের ঘাটতি রয়েছে।

নিরীক্ষকের মতে, এসব পরিস্থিতি কোম্পানিটির ভবিষ্যতে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আর্থিক বিবরণী ‘চলমান প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে প্রস্তুত করা হলেও তা নির্ভর করছে জরুরি ভিত্তিতে আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ সফল হওয়া এবং অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের ওপর।

যৌথ মালিকানার ভবনেও হিসাবের অসঙ্গতি

ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে মতিঝিলের দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় একটি আটতলা ভবনের মালিক। ভবনটির প্রথম তলার অর্ধেক, প্রায় ৪ হাজার ৩৫১ বর্গফুট জায়গা কোম্পানি নিজেদের এসএমই শাখা, শেয়ার বিভাগ ও গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

এই ভাড়া থেকে ২০২৫ সালে কোম্পানির আয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা। কিন্তু নিরীক্ষকের মতে, ভবনের যে অংশ কোম্পানি নিজের কাজে ব্যবহার করছে না এবং ভাড়া দিয়ে আয় করছে, সেটি সাধারণ স্থায়ী সম্পদ হিসেবে না দেখিয়ে ‘বিনিয়োগ সম্পত্তি’ হিসেবে হিসাব করা উচিত ছিল। কোম্পানি পুরো ভবনটিকেই স্থায়ী সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আয়কর হিসাবেও অনিয়ম

কোম্পানির আয়কর হিসাবেও অসঙ্গতি পেয়েছেন নিরীক্ষক। কোম্পানি যে পরিমাণ আয়কর দেওয়ার জন্য হিসাব করেছিল, আয়কর রিটার্নে তার চেয়ে কম কর দেখিয়ে সেই কম পরিমাণই পরিশোধ করেছে। এরপরও অতিরিক্ত হিসেবে রাখা প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার করের প্রভিশন বাতিল বা সমন্বয় করা হয়নি।

এ ছাড়া, কর কর্তৃপক্ষ আগের কয়েক বছরের আয়কর নির্ধারণ সম্পন্ন করলেও সেই চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী কোম্পানির চলতি আয়কর প্রদেয় হিসাব সমন্বয় করা হয়নি।

জমি-ভবনের মূল্যায়নেও দীর্ঘদিনের গাফিলতি

কোম্পানি জমি ও ভবনের মূল্যায়নও দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ করেনি। জমি সর্বশেষ ২০১৭ সালে এবং ভবন ২০১০ সালে পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি।

অথচ হিসাবমান অনুযায়ী সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর সম্পদের মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত, যাতে হিসাবের খাতায় থাকা মূল্য বাজারমূল্য থেকে খুব বেশি ভিন্ন না হয়।

শুধু তা-ই নয়, প্রতি বছর শেষে অবচয়যোগ্য সম্পদের ব্যবহারযোগ্য আয়ুষ্কাল ও ভবিষ্যৎ অবশিষ্ট মূল্যও পর্যালোচনা করা হয়নি। একই সঙ্গে স্থায়ী সম্পদের মূল্য কমে গেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করেনি কোম্পানি। ফলে কোম্পানির সম্পদের প্রকৃত মূল্য আর্থিক বিবরণীতে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক।

মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ১০৯.৬৮ শতাংশ

কোম্পানিটির মূলধন পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১০ সালের ২ আগস্টের সার্কুলার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা ও বাজার শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, ফনিক্স ফাইন্যান্সের ন্যূনতম মোট মূলধন ও মূলধন সংরক্ষণ বাফার মিলিয়ে ১০ শতাংশ থাকার কথা।

কিন্তু কোম্পানিটির এই হার নেমে গেছে ঋণাত্মক ১০৯ দশমিক ৬৮ শতাংশে। অর্থাৎ, যেখানে ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন থাকার কথা, সেখানে কোম্পানিটির মূলধন পর্যাপ্ততায় রয়েছে বিশাল ঘাটতি।

গ্র্যাচুইটির হিসাবেও নিয়ম মানা হয়নি

কর্মীদের গ্র্যাচুইটির হিসাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন নিরীক্ষক। কোম্পানির কর্মীদের জন্য নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক গ্র্যাচুইটি ব্যবস্থা থাকলেও এর প্রয়োজনীয় গাণিতিক মূল্যায়ন করা হয়নি।

এর পরিবর্তে কর্মীদের চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে গ্র্যাচুইটির প্রভিশন হিসাব করা হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এটি সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ভবিষ্যতে কর্মীদের গ্র্যাচুইটি বাবদ কোম্পানির প্রকৃত দায় কত, তা সঠিকভাবে প্রতিফলিত না-ও হয়ে থাকতে পারে। এর প্রভাব কোম্পানির মুনাফা ও মালিকানাস্বত্বের ওপরও পড়তে পারে।

অবণ্টিত লভ্যাংশও জমা হয়নি তহবিলে

কোম্পানি আর্থিক বিবরণীতে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৩ টাকা লভ্যাংশ প্রদেয় হিসেবে দেখিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালের অবণ্টিত লভ্যাংশও রয়েছে।

তিন বছরের বেশি সময় পার হলেও বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী এই অর্থ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) জমা দেয়নি কোম্পানি। এটিকেও বিধিবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন নিরীক্ষক।

ইজারার হিসাবেও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ হয়নি

কোম্পানি ইজারা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড ১৬ বাস্তবায়ন করেনি। ফলে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরের হিসাবে ৪ কোটি ৭৬ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৪ টাকা ব্যবহারের অধিকারভিত্তিক সম্পদ এবং ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৪ টাকা ইজারা দায় হিসেবে দেখানো প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু কোম্পানি তা করেনি। ফলে ইজারা থেকে সৃষ্ট সম্পদ ও দায়ের হিসাব যথাযথভাবে আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হয়নি বলে নিরীক্ষক জানিয়েছেন।

বিনিয়োগকারীদের মালিকানা প্রায় ৭৪ শতাংশ

ফনিক্স ফাইন্যান্স ২০০৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালক ছাড়া অন্যান্য শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৭৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার এমন সংকটের মধ্যেও শেয়ারটি শেয়ারবাজারে লেনদেন হচ্ছে। সোমবার (৩১ আগস্ট) ডিএসইতে ফনিক্স ফাইন্যান্সের শেয়ারদর ছিল ৩ টাকা ৭০ পয়সা।

সব মিলিয়ে বিপুল লোকসান, ঋণাত্মক নিট সম্পদ, ১ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার বেশি তারল্য ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততায় ঋণাত্মক অবস্থান এবং একাধিক হিসাবগত অসঙ্গতি—এসব কারণে ফনিক্স ফাইন্যান্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরীক্ষকের শঙ্কা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন