ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

বেক্সিমকোর সম্পদ নিলামের খবর বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রেখে কেন?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ০৮:২৯:২৪
বেক্সিমকোর সম্পদ নিলামের খবর বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রেখে কেন?

রূপালী ব্যাংকের ১৯১ কোটি টাকা পাওনা। সেই পাওনা আদায়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে থাকা প্রায় ২৬ একর জমি ও সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অথচ তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বেক্সিমকো এ-সংক্রান্ত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) বিনিয়োগকারীদের জানায়নি। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে এসেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় অঙ্কের ঋণ এবং কোম্পানির উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি নিলামে ওঠার উদ্যোগের খবর বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রাখা হলো কেন?

এ ঘটনায় বেক্সিমকো লিমিটেডের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা তলব করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে বিএসইসির ইস্যুয়ার কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের সুপারভিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অব ইস্যুয়ার কোম্পানিজ ডিপার্টমেন্ট থেকে।

বিএসইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে কমিশন জানতে পারে, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বেক্সিমকোর বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে রূপালী ব্যাংক। কিন্তু এ বিষয়ে বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে কমিশন বা সংশ্লিষ্ট স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে কোনো পিএসআই প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ‘বিষয়টি কমিশনের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে নেওয়া হবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত।’

১৯১ কোটি টাকা পাওনা, নিলামে ২৬ একর সম্পত্তি

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংকের পাওনা ১৯১ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বেক্সিমকোর প্রায় ২৬ একর জমি ও সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কোম্পানির উল্লেখযোগ্য সম্পত্তি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় চলে আসার বিষয়টি বেক্সিমকোর আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, নিলামের মাধ্যমে এসব সম্পত্তি হাতছাড়া হলে কোম্পানির সম্পদভিত্তি ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধে কোম্পানির সক্ষমতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

এ কারণেই বিএসইসি মনে করছে, নিলামের বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পিএসআই প্রকাশের বাধ্যবাধকতা ছিল কি না

বিএসইসির বিবেচনায়, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সম্পদ বা দায়দেনার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে—এমন তথ্য বিনিয়োগকারীদের জানানো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ হলে তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে বিষয়টি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ) বিধিমালা, ২০২২’-এর মূল্য সংবেদনশীল তথ্যসংক্রান্ত বিধি-৩-এর উপবিধি (১)(অ)-এর আওতাভুক্ত কি না, তা বিবেচনা করছে কমিশন। পাশাপাশি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের পদ্ধতিসংক্রান্ত বিধি ৬(১)-এর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

তবে কমিশনের পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত নিলামের বিষয়ে বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে কোনো পিএসআই প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও কোম্পানিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিয়োগকারীদের কিছু জানিয়েছিল কি না, সেটিও এখন বিএসইসির প্রশ্নের মুখে।

সাত কার্যদিবসের মধ্যে জবাব

বিএসইসির চিঠিতে নিলামের বিষয়টি কেন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি, তার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোম্পানির অবস্থান ও ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।

চিঠি পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে বিএসইসির কাছে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বেক্সিমকোর পক্ষ থেকে কমিশনের কাছে কোনো জবাব পৌঁছেনি।

একই বিষয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পক্ষ থেকেও বেক্সিমকোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিএসই কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে কোনো উত্তর পায়নি বলে নিশ্চিত করেছে।

বিনিয়োগকারীরা কতটা তথ্য পাচ্ছেন

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির বড় অঙ্কের ঋণ এবং সেই ঋণের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ সাধারণ ব্যবসায়িক তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে কোম্পানির উল্লেখযোগ্য সম্পদ নিলামের মাধ্যমে হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলে সেটি আর্থিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ধরনের তথ্য সময়মতো প্রকাশ না হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে শেয়ার কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্যদিকে, বাজারে যারা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য জানতে পারেন, তাদের সঙ্গে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

তাই বেক্সিমকোর ক্ষেত্রে এখন শুধু ১৯১ কোটি টাকা পাওনা বা ২৬ একর সম্পত্তি নিলামের বিষয়টি নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাসময়ে জানানো হয়েছিল কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, বেক্সিমকোর ব্যাখ্যা পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে কোম্পানিটির জবাব এবং কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর বাজারসংশ্লিষ্টদের।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন