ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

১৪৬ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি, ৩৮ লাখ ঘুষ: এনবিআরের দুই কর্মকর্তার শাস্তি

২০২৬ সেপ্টেম্বর ০৩ ০৮:৪০:৩৩
১৪৬ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি, ৩৮ লাখ ঘুষ: এনবিআরের দুই কর্মকর্তার শাস্তি

কর প্রশাসনে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি নিষ্পত্তি হওয়া আয়কর মামলায় নতুন করে আদেশ তৈরি করে সরকারের ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতির ঘটনায় উপকর কমিশনার লিংকন রায়কে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। আর করদাতার কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা নগদ নিয়ে আয়কর নথির রেকর্ড পরিবর্তনের ঘটনায় সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর পদোন্নতি আট বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

আজ বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এক কর্মকর্তার কাণ্ডে ১৪৬ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

বর্তমানে উৎসে কর ব্যবস্থাপনা ইউনিটে সাময়িক বরখাস্ত থাকা উপকর কমিশনার লিংকন রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কর অঞ্চল-৫, ঢাকার সার্কেল-৯০ (কোম্পানি)-এ কর্মরত থাকাকালে একটি নিষ্পত্তি হওয়া আয়কর মামলায় নতুন করে আদেশপত্র ও কর নির্ধারণ আদেশ তৈরি করেন লিংকন রায়। তার এ কর্মকাণ্ডে সরকারের ১৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৩ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর আওতায় তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়। ব্যক্তিগত শুনানি ও তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

পরে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাবও সন্তোষজনক না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির পথে যায় সরকার। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতিক্রমে লিংকন রায়কে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।

৩৮ লাখ টাকা ঘুষ, বদলে দেওয়া হয় আয়কর নথি

অন্যদিকে, এনবিআরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে থাকা সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর বিরুদ্ধেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর অঞ্চল-৫, ঢাকার সার্কেল-৯৩-এ কর্মরত থাকাকালে করদাতা সালাহউদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা নগদ গ্রহণ করেন জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু। এরপর তার আয়কর নথির অধিকাংশ রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়। পরে পুরোনো রেকর্ড করদাতার মনোনীত প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি পরায়ণতা’র অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয়।

তদন্তে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ‘দুর্নীতি পরায়ণতা’র অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তবে সার্বিক বিষয় বিবেচনায় অসদাচরণের অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

শাস্তি হিসেবে তার পদোন্নতি আট বছরের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহির প্রশ্ন

এক কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে ১৪৬ কোটি টাকার বেশি সরকারি রাজস্ব ক্ষতি এবং আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩৮ লাখ টাকা নগদ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ঘটনায় এনবিআরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

বিশেষ করে কর নির্ধারণ ও আয়কর নথি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অনিয়মের কারণে একদিকে সরকার বিপুল রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে, অন্যদিকে করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া পৃথক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তাই শুধু ব্যক্তিগত অপরাধের শাস্তি নয়, বরং রাজস্ব প্রশাসনে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন