ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩

আগে মুনাফা বাড়ে, টাকা পেলেই কমে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৮:৪২:০৯
আগে মুনাফা বাড়ে, টাকা পেলেই কমে

তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত যখন বিশ্বজুড়ে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আমরা নেটওয়ার্কসের ব্যবসার চিত্র যেন উল্টো। কোম্পানিটি যখন শেয়ারবাজার থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলতে গেছে, তখন মুনাফা ও লভ্যাংশে দেখা গেছে উত্থান। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের পরই শুরু হয়েছে মুনাফার ধারাবাহিক পতন। দুই দফা অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রেই একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সর্বশেষ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মুনাফা থেকে লোকসানে চলে গেছে কোম্পানিটি।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের আগে আমরা নেটওয়ার্কসের মুনাফা কি বাস্তব ব্যবসায়িক সক্ষমতার প্রতিফলন ছিল, নাকি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে তা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল? কারণ, কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০১৭ সালের আইপিও এবং ২০২৪ সালের রাইট শেয়ার—দুই দফা অর্থ উত্তোলনের আগেই মুনাফা বেড়েছে। কিন্তু অর্থ হাতে পাওয়ার পর তা আর ধরে রাখতে পারেনি কোম্পানিটি।

আইপিওর আগে উত্থান, টাকা নেওয়ার পর পতন

২০১৭ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসে আমরা নেটওয়ার্কস। ওই সময় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিটি শেয়ার ৩৯ টাকা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৩৫ টাকা দরে শেয়ার ছেড়ে কোম্পানিটি সংগ্রহ করে ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

আইপিওতে আসার আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৬২ পয়সা। এরপর ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মুনাফা বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় উল্টো চিত্র।

আইপিওর পর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইপিএস ৪ টাকা ১ পয়সা থেকে কমে ৪ টাকায় নামে। পরের অর্থবছরে তা আরও কমে ৩ টাকা ১৯ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ টাকা ১৪ পয়সা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ টাকা ৮৫ পয়সায় নেমে আসে।

অর্থাৎ আইপিওতে অর্থ উত্তোলনের পর কয়েক বছর ধরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। অথচ রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হঠাৎ করেই মুনাফায় বড় উত্থান দেখা যায়।

২০২২-২৩ অর্থবছরে কোম্পানিটির ইপিএস বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ৬৪ পয়সা। ওই বছর নিট মুনাফা হয় ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। একই সঙ্গে লভ্যাংশও আগের তুলনায় বাড়িয়ে ১১ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১ টাকা ১০ পয়সা ঘোষণা করা হয়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় ৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা ওই বছরের মুনাফার প্রায় ৩০ শতাংশ।

রাইট শেয়ারের আগে আবারও মুনাফা বৃদ্ধি

রাইট শেয়ার ইস্যুর ঠিক আগের অর্থবছরেই মুনাফার এমন উত্থান দেখা যায়। এরপর ২০২৪ সালে দুইটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার ইস্যু করে আমরা নেটওয়ার্কস।

প্রতিটি রাইট শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয় ৩০ টাকা। এর মধ্যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ছিল ২০ টাকা প্রিমিয়াম। এই রাইট শেয়ারের মাধ্যমে কোম্পানিটি সংগ্রহ করে ৯২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

অর্থাৎ আইপিওর মাধ্যমে সংগ্রহ করা ৫৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার পর দ্বিতীয় দফায় রাইট শেয়ারের মাধ্যমে আরও প্রায় ৯৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। দুই দফায় প্রিমিয়ামসহ শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সংগ্রহ করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা।

আইপিওর সময় সংগৃহীত অর্থের মধ্যে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ এবং অবশিষ্ট অর্থ আইটি খাতের বিভিন্ন উন্নয়নে ব্যবহারের কথা জানিয়েছিল কোম্পানিটি। আর রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থের মধ্যে ২১ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ এবং বাকি অর্থ আইটি ব্যবসার উন্নয়নে ব্যয়ের কথা বলা হয়।

টাকা হাতে পাওয়ার পরই আবার পতন

রাইট শেয়ারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের পরও মুনাফার সেই উত্থান ধরে রাখতে পারেনি আমরা নেটওয়ার্কস।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ টাকা ৬৪ পয়সা ইপিএস থেকে পরের অর্থবছরেই তা কমে ২ টাকা ৪৬ পয়সায় নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও ভয়াবহ পতন হয়ে ইপিএস দাঁড়ায় মাত্র ১৩ পয়সায়।

এরপর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটি মুনাফা থেকেও বেরিয়ে গেছে। জুলাই ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪৪ পয়সা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ছিল ৭৭ পয়সা।

অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে রাইট শেয়ার ইস্যুর আগের ৩ টাকা ৬৪ পয়সার ইপিএস থেকে কোম্পানিটি এখন ৪৪ পয়সা লোকসানে।

লভ্যাংশেও একই চিত্র

মুনাফার পাশাপাশি লভ্যাংশের ক্ষেত্রেও অর্থ উত্তোলনের আগে-পরে বড় পার্থক্য দেখা যায়।

আইপিওতে উচ্চ প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করলেও পরবর্তী বছরগুলোতে আমরা নেটওয়ার্কসের লভ্যাংশ মূলত ১০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১ টাকার মধ্যে আটকে ছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আট বছরের মধ্যে ছয় বছরই ১০ শতাংশ করে লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি।

তবে রাইট শেয়ার ইস্যুর আগে মুনাফা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লভ্যাংশও বাড়ানো হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া হয়। কিন্তু রাইট শেয়ারের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার পর লভ্যাংশের চিত্রও দ্রুত বদলে যায়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ০.১০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১ পয়সা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে কোম্পানিটি। অর্থাৎ একসময় যে কোম্পানি ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দিত, অর্থ উত্তোলনের পর সেই লভ্যাংশ নেমে এসেছে নামমাত্র পর্যায়ে।

বিনিয়োগকারীদের টাকার ফল কী?

দুই দফায় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের সময় কোম্পানির ব্যবসায়িক ফলাফল এবং পরবর্তী সময়ের ফলাফলের মধ্যে এমন বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বিশেষ করে অর্থ উত্তোলনের আগে মুনাফার উত্থান এবং অর্থ উত্তোলনের পরপরই ধারাবাহিক পতনের পুনরাবৃত্তি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনের মান ও মুনাফার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। মুনাফা বাস্তব ব্যবসায়িক সক্ষমতার কারণে বেড়েছিল, নাকি অর্থ উত্তোলনের প্রয়োজনকে সামনে রেখে তা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে আমরা নেটওয়ার্কসের পরিশোধিত মূলধন ৯২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাইরে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৬৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ কোম্পানিটির মালিকানার বড় অংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) লেনদেন শেষে ডিএসইতে আমরা নেটওয়ার্কসের শেয়ারদর দাঁড়িয়েছে ১৭ টাকা ৭০ পয়সা। ফলে ৩০ টাকা দরে রাইট শেয়ারে অর্থ দেওয়া বিনিয়োগকারীদের জন্যও বর্তমান বাজারদর বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে আমরা নেটওয়ার্কসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন ব্যবসা কেন খারাপ হলো, তা নয়; বরং শেয়ারবাজার থেকে টাকা নেওয়ার আগে মুনাফা বাড়ে, আর টাকা নেওয়ার পরই কেন সেই মুনাফা ধরে রাখা যায় না—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে
Close
Facebook Facebook-এ ফলো করুন